দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন তারেক রহমান মঙ্গলবার (১৭ই ফেব্রুয়ারী) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলীয় জোটের বিপুল বিজয়ের পর রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাকে এবং ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভাকে শপথ বাক্য পাঠ করান।
এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনের অবসান ঘটল। দক্ষিণ এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবর্তন বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২১১টি আসনে জয়লাভ করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত-ই-ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৭৭টি আসন পেয়ে সংসদীয় বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে।
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯.৮৮ শতাংশ, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একইসাথে ‘জুলাই চার্টার’ নামে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। দলটির কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল এবং হাসিনা বর্তমানে ভারতে পলাতক রয়েছেন।
তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনা। তিনি অনেক বছর পর দেশের পুরুষ প্রধানমন্ত্রী হলেন—গত ৩৫ বছরে ক্ষমতা ঘুরে বেড়িয়েছে তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার মধ্যে।
তারেক রহমানের পিতা জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালে ক্ষমতায় আসেন এবং ১৯৮১ সালে নিহত হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং দুই দফায় দেশ শাসন করেন। তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মৃত্যুবরণ করেন।
২০০৮ সালে যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে যান তারেক রহমান। ১৭ বছর নির্বসন কাটিয়ে গত ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফেরেন।
শপথ অনুষ্ঠানে প্রায় ১,২০০ জন দেশি-বিদেশি অতিথি উপস্থিত ছিলেন। ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা দেশটির প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ মুইজু, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ছেরিং তোবগে, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল এবং শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নলিন্দ জয়তিস্সা উপস্থিত ছিলেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস তার বিদায়ী ভাষণে বলেছেন, “আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে দেশে আর কখনো যেন স্বৈরাচার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। সেজন্যই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।”
নতুন সরকারের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে যে সংসদ সদস্যরা একইসাথে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন, তবে বিএনপি এই দ্বিতীয় শপথ প্রত্যাখ্যান করেছে।
তারেক রহমান নির্বাচনের পর প্রথম বক্তৃতায় জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য হলো সম্মিলিত শক্তি, আর বিভাজন দুর্বলতা। আমাদের পথ ও মতামত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”
বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ১৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশটি এখন গণতান্ত্রিক পথে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তারেক রহমানের সরকারের সফলতা নির্ভর করবে তিনি কীভাবে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করতে পারেন এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারেন তার উপর।