ভোরের ঢাকায় ১০ টাকার পরোটা, ফ্রি হালুয়া—এক অচেনা গল্প

ঢাকা, ভোর সাড়ে চারটা।
রাস্তার বাতি তখনও জ্বলছে, শহরের কোলাহল এখনো শুরু হয়নি। কিন্তু কিছু কিছু মোড়ে দেখা যায় ছোট ছোট কার্ট। কার্টের মাথায় লাল কাপড় বাধা, ভেতরে বড় গামলার মধ্যে— ‘পরোটা -হালুয়া ’।
ভোররাতের ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য এ যেন এক নীরব স্বস্তি।

রিকশাচালক, ড্রাইভার, বাস হেলপার, নৈশ প্রহরী—সকালের এই পরোটা-হালুয়াই তাদের দিনের প্রথম খাবার। কেউ কেউ বলেন, “ভাই, ১০ টাকায় পেট ভরে যায়, আর কী চাই!”

একই কার্ট, একই রঙ, একই মেন্যু

মজার ব্যাপার হলো, শুধু ঢাকাই নয়—নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, এমনকি কুমিল্লা পর্যন্ত একই রকম কার্ট দেখা যায়। লাল রঙ, একই হালুয়া, একই ঢঙে বড় করে বানানো পরোটা। দেখে মনে হয় কোনো বড় কোম্পানির ফুড চেইন, কিন্তু নাম নেই, ঠিকানা নেই।

এক বিক্রেতা জানালেন, “আমরা মালিক না ভাই, কমিশনে বিক্রি করি। কার্ট, পরোটা—হালুয়া সব মালিকের। আমরা শুধু বিক্রি করি, বিক্রির ওপর কমিশন পাই।” তার ভাষায়, প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টাকার মতো আয় হয়।

বেকারির বেচে যাওয়া ডো

এই পরোটা কোথা থেকে আসে?
কিছু বেকারি মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাদের অনেক সময় বাড়তি ডো (ময়দার খামির) থেকে যায়। সেটাই পরে সস্তায় বিক্রি হয় “কার্টওয়ালাদের” কাছে। এই ডো থেকেই তৈরি হয় ভোররাতের পরোটা—ছেঁড়া, থাপড়া, ভাজা। এর সঙ্গে থাকে হালুয়া—

অদৃশ্য চেইনের গন্ধ

এই কার্টগুলোর ডিজাইন আর উপকরণের মিল দেখে বোঝা যায়, কোনো কেন্দ্রীয় জায়গা থেকে সবকিছু সরবরাহ করা হয়।
একজন বিক্রেতা বললেন, “সব মাল জোগায় এক লোক। আমরা শুধু জায়গা পালটে বিক্রি করি। সকালের পর কার্ট সরিয়ে ফেলি।”

এই নেটওয়ার্ক ঠিক কীভাবে পরিচালিত হয়, বা এর মূল উদ্যোক্তা কে—তা এখনো অজানা। তবে এটি নিছক ছোট ব্যবসা নয়, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত এক অদৃশ্য ফ্র্যাঞ্চাইজি নেটওয়ার্ক

খাদ্য নিরাপত্তা কোথায়?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, “রাস্তার এই ধরনের খাবার নিরাপদ নয়। পুরনো ডো, নিম্নমানের তেল, অপরিষ্কার পানি—এসবই খাদ্যজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু বেশিরভাগ সময় এসব ব্যবসার কোনো নিবন্ধন থাকে না।”

তবে নজরদারির অভাবেই তারা নির্বিঘ্নে টিকে আছে। কেউ অভিযোগ করে না, কারণ ক্রেতারা জানেন—এই খাবারটাই তাদের নাগালের মধ্যে।

শহরের ক্ষুধা ও বেঁচে থাকার লড়াই

এই পরোটা-হালুয়ার গল্প আসলে শহরের আরেক গল্প—অদৃশ্য মানুষদের বেঁচে থাকার গল্প।
রিকশাচালক সেলিম মিয়া বললেন, “রাতভর রিকশা চালিয়ে সকালে কিছু খাই। ১০ টাকায় পরোটা-হালুয়া পাই, তাতে পেট ভরে যায়। হোটেলে গেলে কমপক্ষে ৪০ টাকা লাগে।”

অন্যদিকে এই কার্টের মালিকরা হয়তো শহরের আরেক প্রান্তে বসে মুনাফার হিসাব কষছেন। ঢাকার ভোররাত তাই এক অদ্ভুত মিলনমেলা—ক্ষুধা, কৌশল আর টিকে থাকার।

এটি একদিকে দারিদ্র্যের প্রতীক, অন্যদিকে এক অচেনা অর্থনীতির চিহ্ন।
যেখানে খাদ্য মান নয়, টিকে থাকাটাই বড় কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *