মারুফ আহমেদ
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে আরেকটি বেদনাময় অধ্যায় যুক্ত হলো। যে ম্যাচটি জেতার কথা ছিল, সেটি হেরে গেল বাংলাদেশ—৪-৩ গোলে হংকংয়ের কাছে। অথচ এই খেলায় জয় বাংলাদেশের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করতে পারত। দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমী ভেবেছিল—হামজা চৌধুরীর উপস্থিতিতে দল এবার নতুন ইতিহাস লিখবে। কিন্তু মাঠে যা দেখা গেল, তা শুধু পরাজয় নয়; বরং এক দৃশ্যমান সিন্ডিকেটের কালো ছায়ায় ঢেকে যাওয়া এক ভয়াবহ প্রহসন।
বাংলাদেশ দল হারেনি—হেরেছে কোচ হাভিয়ের কাব্রেরার একগুঁয়েমি, দুর্নীতিগ্রস্ত টিম ম্যানেজমেন্ট ও ‘বসুন্ধরা সিন্ডিকেট’-এর কারসাজির কাছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, কাব্রেরা কোনো যুক্তি নয়, নিজের মনগড়া একাদশ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। সাদ উদ্দিন-ফাহিম সোহেল রানারা ৬০ মিনিট খেলেও মাঠে ছিল না কোনো ছন্দ, কোনো আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা। অথচ যখন সামিত সোম, ফাহমিদুল, জায়ান আহমেদ মাঠে নামলেন, তখনই মাঠে প্রাণ ফিরে আসে—হামজার সঙ্গে তাদের সমন্বয়ে দেখা যায় পরিকল্পিত খেলার ইঙ্গিত। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
প্রশ্ন উঠেছে—কেন অভিষেকেই আলোচনায় আসা সামিত সোম-কে শুরু থেকে বসিয়ে রাখা হলো? কেন গোলকিপার জিকো, অভিজ্ঞ জামাল ভূঁইয়া বা নতুন প্রজন্মের ফাহমিদুল ইসলামদের মতো পরীক্ষিত খেলোয়াড়দের জায়গা হলো না শুরুর একাদশে? উত্তর একটাই—সিন্ডিকেট।
ফেডারেশনের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে থাকা এক গোষ্ঠী—যাদের হাত ধরে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে গুরুত্ব পায় ‘নিজস্ব খেলোয়াড়’ আর ‘ক্লাবের স্বার্থ’। এই গোষ্ঠীর নাম এখন ফুটবল মহলে পরিচিত—বসুন্ধরা সিন্ডিকেট নামে। তাদের প্রভাব এতটাই প্রবল যে, জাতীয় দলের একাদশও নাকি ঠিক হয় তাদের ইচ্ছেমতো।
এই সিন্ডিকেটের মদদেই কাব্রেরা বারবার এমন একাদশ নামাচ্ছেন, যেটা মাঠে দাঁড়াতেও হিমশিম খায়। যোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়রা পড়ে থাকছেন বেঞ্চে—আর যারা ‘পছন্দের তালিকায়’ আছে, তারা সুযোগ পাচ্ছে একের পর এক ব্যর্থতার পরও।
হংকং ম্যাচের পর দেশজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফুটবলপ্রেমীদের ক্ষোভ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। অনেকে লিখেছেন—“বাংলাদেশ হেরে যায়নি, হেরেছে কাব্রেরার একনায়কতন্ত্রে।” অন্যরা বলছেন—“হামজার চোখের নীরব অশ্রু যেন পুরো জাতির কান্না।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান কোচ ও ম্যানেজমেন্টের এই সিন্ডিকেট-নির্ভর দল নির্বাচনের কারণে মাঠে প্রতিভা নয়, জায়গা পাচ্ছে তোষামোদ। প্রবাসী খেলোয়াড়দের অবদান ও পরিশ্রমকে উপেক্ষা করে এই ‘ঘরোয়া ক্লাব রাজনীতি’ এখন জাতীয় ফুটবলের প্রাণশক্তিকেই নিঃশেষ করছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আওয়াল এবং ফুটবল টেকনিক্যাল কমিটির সদস্যরা এই সিন্ডিকেটের অংশ কিনা? যদি না হন, তাহলে কেন বারবার এমন সিদ্ধান্তে তারা নীরব?
আজকের এই হারের দায় শুধু কোচের নয়, বরং পুরো ফুটবল প্রশাসনের। হামজা, ফাহমিদুল, জায়ান, সামিত সোম—এরা যখন নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিচ্ছে, তখন ফেডারেশনের ওপর ভর করছে লবিং, আত্মীয়তা আর ঘরোয়া ক্লাব রাজনীতি।
বাংলাদেশের ফুটবলকে যদি বাঁচাতে হয়, তবে এখনই এই সিন্ডিকেট ভাঙা জরুরি।
প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে—হাভিয়ের কাব্রেরাকে অবিলম্বে বহিষ্কার করা, এবং টিম সিলেকশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীন ও যোগ্যতা নির্ভর করা।
বাংলাদেশের ফুটবল এখনও বেঁচে আছে কোটি মানুষের ভালোবাসায়। এই ভালোবাসা, এই বিশ্বাস, একদল দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার কারণে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।
ফুটবল জাতির কাছে শুধু খেলা নয়—এটা গর্ব, ঐতিহ্য আর আত্মমর্যাদার প্রতীক।
তাই আজ সময় এসেছে জাতি এক কণ্ঠে বলার—
“জাতীয় দল কোনো ক্লাবের বর্গা নয়—এটা জনগণের দল।”
যেদিন বসুন্ধরা সিন্ডিকেটের জাল ছিন্ন হবে, সেদিনই বাংলাদেশ ফুটবল আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
জাতি সেই দিনের অপেক্ষায়।