পেন্টাগন কংগ্রেসকে জানিয়েছে, মার্কিন হামলার আগে ইরান কোন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল না

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানের ন্যায়সঙ্গতা নিয়ে ওয়াশিংটনে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেসে দেওয়া এক গোপন ব্রিফিংয়ে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে যাচ্ছে—এমন কোনো নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য তাদের কাছে ছিল না।

এই তথ্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। হামলার আগে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ইরান হয়তো প্রতিরোধমূলকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর আঘাত হানতে পারে।

রোববার (১লা মার্চ) পেন্টাগনের কর্মকর্তারা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের জাতীয় নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যদের প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে ব্রিফিং দেন। সেখানে বলা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনী মার্কিন স্বার্থের জন্য “সম্ভাব্য হুমকি” ছিল, তবে ইরান অবিলম্বে আক্রমণ করতে যাচ্ছে—এমন তথ্য ছিল না।

এই স্বীকারোক্তির পর ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে হামলার সিদ্ধান্ত কী ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল।

শনিবার (২৮শে ফেব্রুয়ারি) শুরু হওয়া “অপারেশন মিডনাইট হ্যামার” অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালায়। প্রশাসনের দাবি, অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হয়েছেন এবং এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম), জানিয়েছে যে সংঘাতে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। আরও কয়েকজন সামান্য আঘাত পেয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান দ্রুত এমন সক্ষমতা অর্জন করছিল যাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাত করতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এমন দাবি সমর্থন করার মতো সুস্পষ্ট প্রমাণ তাদের কাছে নেই।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সোমবার (২রা মার্চ) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত জুনের অভিযানে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি “ধ্বংসস্তূপে পরিণত” হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা জোরদার করছিল।

ডেমোক্র্যাটরা এই সংঘাতকে “পছন্দের যুদ্ধ” বলে উল্লেখ করছেন। তাঁদের অভিযোগ, ওমানের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনার পথ ছেড়ে দিয়ে প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপ বেছে নিয়েছে।

রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ২৭ শতাংশ নাগরিক হামলাকে সমর্থন করেছেন, ৪৩ শতাংশ বিরোধিতা করেছেন এবং ২৯ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন।

সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। ইজরায়েলি বাহিনী লেবাননে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। বেইরুতে বড় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নাগরিকদের লেবানন ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে।

মঙ্গলবার (৩রা মার্চ) পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ এবং সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ পুরো কংগ্রেসকে ব্রিফিং দেবেন বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।

হোয়াইট হাউস বলছে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, আরও হতাহতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

পেন্টাগনের সাম্প্রতিক ব্রিফিংয়ের পর মূল প্রশ্নটি এখন আরও স্পষ্ট—ইরান কি সত্যিই তাৎক্ষণিক আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, নাকি সম্ভাব্য হুমকিকে ভিত্তি করেই বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, এই যুদ্ধকে ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *