২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে একটি “বড় যুদ্ধাভিযান” শুরু করেছে। পরে পেন্টাগন অভিযানের নাম দেয় অপারেশন এপিক ফিউরি।
ট্রাম্প বলেন, লক্ষ্য একটাই—ইরান যেন কখনও পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। তিনি সতর্ক করে জানান, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা “সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস” করা হবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, অভিযানের প্রথম দিনেই ইরানের ১,২৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ১১টি ইরানি জাহাজও ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তুরস্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, শুধু প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার।
এর আগেই সামরিক প্রস্তুতিতে খরচ হয়েছে আরও প্রায় ৬৩০ মিলিয়ন ডলার—বিমান পুনর্বিন্যাস, নৌবহর মোতায়েন এবং আঞ্চলিক সম্পদ সক্রিয় করতে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি ও প্রথম দিনেই ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার।
সেন্টকম জানিয়েছে, এই অভিযানে ২০টির বেশি অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে।
আকাশপথে অংশ নিয়েছে বি-১ ও বি-২ স্টিলথ বোমারু, এফ-৩৫ ও এফ-২২ যুদ্ধবিমান, এফ-১৫ ও এফ-১৬ জেট, এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমান ইএ-১৮জি গ্রোলার।
ড্রোন ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে এমকিউ-৯ রিপার। নৌবাহিনী থেকে ছোড়া হয়েছে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। স্থলভিত্তিক হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে হিমার্স রকেট সিস্টেম।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় মোতায়েন রয়েছে প্যাট্রিয়ট ও থাড ব্যবস্থা।
দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ—ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে—অঞ্চলে অবস্থান করছে। একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় বলে সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি -এর হিসাব।
আধুনিক যুদ্ধ শুধু কৌশলের নয়, অর্থেরও লড়াই।
- একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১.৫–২ মিলিয়ন ডলার
- একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার
- একটি এসএম-৩ ইন্টারসেপ্টর ১২–১৫ মিলিয়ন ডলার
এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রতি ফ্লাইট ঘণ্টায় খরচ প্রায় ৩৬ হাজার ডলার। বি-২ বোমারু বিমানের ক্ষেত্রে তা ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টার-এর সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার প্রিবল বলেন, পেন্টাগন আনুষ্ঠানিক ব্যয় প্রকাশ করেনি। তবে অনুমান করা যায়—
- ১ মাসে: ৬–১৫ বিলিয়ন ডলার
- ৩ মাসে: ২০–৪৫ বিলিয়ন ডলার
- ৬ মাসে: ৫০–৯০ বিলিয়ন ডলার
- ১ বছরে: ১০০–২০০ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি
ব্রাউন ইউনিভার্সিটি ওয়াটসন ইন্সটিটিউট -এর তথ্য অনুযায়ী, ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় ছিল প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। আফগানিস্তান যুদ্ধে প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। ৯/১১-পরবর্তী সব যুদ্ধ মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
প্রিবলের মতে, শুধু অর্থ নয়, বড় প্রশ্ন হলো অস্ত্রের মজুদ।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ইরান প্রতি মাসে ১০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র মাসে মাত্র ছয় বা সাতটি ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে পারে।
এই ইন্টারসেপ্টরগুলোর প্রয়োজন ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে।
সংঘাত যদি ছড়িয়ে পড়ে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয়, তবে বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা আসতে পারে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০–১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি ১–২ শতাংশ বাড়তে পারে। মন্দার ঝুঁকিও বাড়বে।
স্বল্পমেয়াদে কয়েক বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের মধ্যে সামাল দেওয়া সম্ভব।
কিন্তু যদি সংঘাত ইরাক যুদ্ধের মতো দীর্ঘস্থায়ী হয়, বিশেষ করে স্থল অভিযান যুক্ত হয়, তবে ব্যয় ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি যেতে পারে।
প্রিবলের ভাষায়, “খরচের দিক থেকে এটি টেকসই। কিন্তু প্রশ্ন হলো অস্ত্রের মজুদ।”
অর্থাৎ, যুদ্ধ কত দিন চলবে—তার উত্তর হয়তো শুধু বাজেট নয়, বরং অস্ত্রভাণ্ডারের গভীরতার ওপরই নির্ভর করছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্ট, স্টিমসন সেন্টার, নিউ অ্যামেরিকান সিকিউরিটি সেন্টার, আনাদোলু সংবাদ সংস্থা