ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাব–এ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন-ইসরায়েল ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬৫ শিশু নিহত হয়েছে । আহত হয়েছে আরও প্রায় ৯৫ জন। ঘটনাটি ঘটেছে ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে, যখন শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিচ্ছিল।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, “শাজারেহ তায়েবেহ” নামের স্কুল ভবনে সরাসরি আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্র। ভবনের একটি অংশ ধসে পড়ে। নিহতদের বেশিরভাগই সাত থেকে বারো বছর বয়সী ছাত্রী।
হামলার দায় নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল প্রকাশ্যে কিছু স্বীকার করেনি। তবে ইরান অভিযোগ করেছে, এটি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আক্রমণের অংশ ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র “ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো স্কুলকে লক্ষ্যবস্তু করে না” এবং ঘটনার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা–এর ডিজিটাল তদন্ত ইউনিট স্যাটেলাইট ছবি, ভিডিও ফুটেজ এবং পূর্ববর্তী মানচিত্র বিশ্লেষণ করে বলেছে, স্কুলটি অন্তত ২০১৬ সাল থেকে পাশের একটি সামরিক স্থাপনা থেকে আলাদা করা ছিল।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়:
- ২০১৩ সালে স্কুলটি একটি সামরিক কমপ্লেক্সের ভেতরে ছিল।
- ২০১৬ সালে নতুন দেয়াল তোলা হয় এবং স্কুলের জন্য আলাদা প্রবেশপথ তৈরি করা হয়।
- সামরিক চেকপোস্ট থেকে স্কুলের প্রবেশদ্বার ২০০–৩০০ মিটার দূরে ছিল।
- হামলায় স্কুল ও সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মাঝখানের একটি ক্লিনিক অক্ষত ছিল।
এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে আল জাজিরা প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত, নাকি পরিকল্পিত হামলা?
এই দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। সামরিক সূত্র থেকেও এখনো বিস্তারিত টার্গেটিং তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মুখপাত্র রাভিনা সামদাসানি ঘটনাটিকে “ভয়াবহ” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও এই সংঘাতের নিষ্ঠুর বাস্তবতা তুলে ধরে।
ইউনেস্কো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী শিক্ষাকর্মী মালালা ইউসুফজাই সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক স্থাপনা—বিশেষ করে স্কুল বা হাসপাতাল—লক্ষ্যবস্তু করা হলে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে কোনো হামলা যুদ্ধাপরাধ কি না, তা নির্ধারণের জন্য স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
-
১৯৭০: মিশরের বাহর আল-বাকার স্কুলে ইসরায়েলি হামলায় ৪৬ শিশু নিহত। ইসরায়েল দাবি করেছিল এটি সামরিক ঘাঁটি। পরে এক ইসরায়েলি পাইলট কবরস্তানে স্বীকার করেন, তারা জানতেন এটি শুধু স্কুল।
-
১৯৯১: বাগদাদের আমিরিয়া আশ্রয়কেন্দ্রে মার্কিন বোমা হামলায় ৪০৮ বেসামরিক নাগরিক নিহত।
-
১৯৯৬: লেবাননের কানায় জাতিসংঘ শিবিরে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে ১০৬ নিহত। জাতিসংঘ তদন্তে ইচ্ছাকৃত হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়।
—এসব ঘটনায় শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল। পরবর্তী তদন্তগুলোতে লক্ষ্যবস্তুর প্রকৃতি নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছে।
মিনাবে নিহত শিশুদের গণজানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিছু পরিবার একই হামলায় একাধিক সন্তান হারিয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়। হাসপাতালের মর্গে জায়গা না থাকায় অস্থায়ী রেফ্রিজারেটেড ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছে।
এই হামলা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সংঘাতের সময় বেসামরিক অবকাঠামো রক্ষার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর?
যতক্ষণ না স্বাধীন তদন্ত শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: মিনাবের সেই সকালে শতাধিক শিশুর জীবন থেমে গেছে, এবং তাদের মৃত্যুর ব্যাখ্যা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে।