একটি ইফতার মাহফিল এবং এক সুতোয় বাঁধা একদল প্রাণের গল্প

জাকির হোসেন

মানুষ বড় অদ্ভুত জীব। সে সারা জীবন ছোটে অজানার পেছনে, অথচ দিনশেষে তার খুব সামান্য কিছু চাই। একটু মমতা, একটুখানি ভালোবাসা আর এক টেবিলে বসে ইফতার করার মতো কিছু আপন মানুষ। সোমবার (৯ই মার্চ) টাঙ্গাইলের সাধারণ গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে ঠিক এমন এক মায়ার জগত তৈরি হয়েছিল। উপলক্ষ ছিল ‘সাংস্কৃতিক কর্মী কল্যাণ সংস্থা’ আয়োজিত ১৩তম ইফতার ও দোয়া মাহফিল।

আকাশের রঙ তখন ফিকে হয়ে আসছে। বসন্তের শেষ বিকেলের হালকা হাওয়া টাঙ্গাইলের প্রাচীন গাছগুলোর পাতায় অদ্ভুত এক শব্দ তুলছে। সেই হাওয়ায় ভেসে আসছিল তসবিহ পাঠ আর ইফতারের প্রস্তুতির টুংটাং শব্দ। এই আয়োজনটি যেন শুধু খাবারের ছিল না, ছিল একদল মানুষের হৃদয়ের টান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খন্দকার নাজিম উদ্দীন, নিরাপদ সড়ক চাই এর সভাপতি সংগীতের মানুষ ফিরোজ আহমেদ বাচ্চু, অধ্যাপক তরুণ ইউসুফ, অধ্যাপক আলী হোসেন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মাসুম, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নূর মোহাম্মদ রাজ্যর মতো গুণীজনরা। ছিলেন হিন্দু মহাজোটের সভাপতি বিপ্লব দত্ত পল্টনও। এই যে এক সারিতে বসে ভিন্ন ভিন্ন মত আর পথের মানুষেরা ইফতারের প্রতীক্ষা করছেন—এটাই তো প্রকৃত বাংলাদেশ। “মানুষের মাঝে বিভেদ থাকতে পারে, কিন্তু ক্ষুধার রঙ আর প্রার্থনার সুর সবার এক।”

সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও কার্যকরী সভাপতি মো. জাকির হোসেন এবং সভাপতি তালহা আল মাহমুদ যখন আগতদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিলেন, তখন তাদের চোখেমুখে ছিল এক ধরনের তৃপ্তি। পি.সি. সরকার সাংস্কৃতিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এস. এম. মানিক, সত্যধাম এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি-সংগীতশিল্পী লিজু বাউলা, সাধারণ সম্পাদক এস. এম. রেজাউল ইসলাম সোহাগ থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রিয় মুখ নাট্যকার- অভিনয়- সংগীত- নৃত্য শিল্পী শাহনাজ সিদ্দিকী মুন্নী, ট্যাক সংগীত শিল্পী মাহাবুব হোসেন, সংগীত শিল্পী শামীমা আক্তার নিলু, জিনাত রেহানা, অমলা, নৃত্য পরিচালক মেহেদী হাসান রিপন, নৃত্য পরিচালক হাবিবুর রহমান হাবিব, অভিনয় শিল্পী হেলাল মাস্টার, মাহমুদুল হাসান, বর্ষা মনি,  ডা. জহুরুল ইসলাম মিরাজ—সবাই মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল, কোনো এক অদৃশ্য সুতোয় সবাইকে বেঁধে রাখা হয়েছে।

ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে যখন মোনাজাত শুরু হলো, তখন চারিদিক নিস্তব্ধ। মোনাজাত পরিচালনা করছিলেন মওলানা জলিল। হাতগুলো যখন আকাশের দিকে উঠল, তখন সেখানে কোনো উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ছিল না। দেশ, জাতি আর মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনায় প্রতিটি কণ্ঠ যেন এক সুরে মিলেমিশে যাচ্ছিল।

বক্তারা বলছিলেন আত্মশুদ্ধির কথা। আসলে রমজান তো কেবল না খেয়ে থাকা নয়, রমজান হলো নিজের ভেতরের ক্ষুদ্রতাকে বিসর্জন দেওয়া। ইফতার মাহফিল কেবল পেট ভরার আয়োজন নয়, এটি হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের সেতু তৈরির মাধ্যম। এরফানুজ্জামান রুনুর তত্ত্বাবধানে এবং মাহাবুব হোসেন তালুকদারের ব্যবস্থাপনায় পুরো অনুষ্ঠানটি যেন একটি সুশৃঙ্খল পরিবারের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল।

সূর্যটা যখন দিগন্তের ওপারে হারিয়ে গেল, তখন সাধারণ গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণ ছেড়ে মানুষগুলো ফিরছিলেন নিজ নিজ গন্তব্যে। কিন্তু তাদের সাথে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আয়োজকরা জানিয়েছেন, এই মানবিক আর সামাজিক কার্যক্রম তারা ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাবেন।

হয়তো আগামী বছর আবার দেখা হবে। হয়তো সেদিনও বসন্তের বাতাস থাকবে, কিন্তু স্মৃতিগুলো হবে আরও প্রগাঢ়। মানুষ বাঁচে আশায়, আর এমন কিছু সন্ধ্যার স্মৃতি মানুষকে আরও অনেকটা দিন বেঁচে থাকার শক্তি দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *