আজ শুধু নিজেকে জীবিত মনে করার জন্যই আমি ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। টেডি আর ক্লোয়িকে সঙ্গে নিয়ে কিছুটা হেঁটেছি, কিছুটা গাড়ি চালিয়ে শহর ঘুরেছি। কিন্তু এই শহর এখন আর নিজের মতো লাগে না।
গত সপ্তাহ পর্যন্ত আমার কুকুর দুটোকে অপবিত্র আর নিষিদ্ধ বলে ধরা হতো। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বুকের ভেতর ভয় কাজ করত। চোখে চোখ পড়া এড়াতে চেষ্টা করতাম।
কিন্তু এখন দৃশ্যটা বদলে গেছে। এখন মানুষ কুকুরের দিকে মায়া নিয়ে তাকায়। আর যারা দমন-পীড়ন করত, তাদের এখন আরও বড় ঝামেলা সামলাতে হচ্ছে।
আমি প্রায় দুই ঘণ্টা তেহরান শহর ঘুরে বেড়িয়েছি। উপর থেকে দেখলে শহরটাকে এখনও স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু তার চামড়ার নিচে নীরবে ভয় চলাফেরা করছে।
গত রাতে শহরান, সোহানাক, পারদিস আর দক্ষিণ তেহরানের তেল ডিপোগুলোতে হামলা হয়েছে।
আজ সকাল থেকেই সেই হামলার প্রভাব শহরের মুখে স্পষ্ট। মানুষের চোখে এখন ভয় আরও পরিষ্কার।
গ্যাস স্টেশনগুলোতে ভয়াবহ ভিড়। তাজরিশের দোকানপাট খোলা আছে। স্টোরগুলোও চলছে। দেখলে মনে হয় শহর যেন আগের মতোই জীবন চালিয়ে যাচ্ছে।
ফোন এখনও কাজ করছে। আমার মা প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর ফোন করেন। কথা হয় মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড।
— তুমি ঠিক আছো?
— কোনো খবর আছে?
— বাইরে যেও না।
এই ত্রিশ সেকেন্ডের কথোপকথনই আমাকে মনে করিয়ে দেয়— আমি এখনও বেঁচে আছি।
কিন্তু এই যে স্বাভাবিকতা— এটা আসলে উদ্বেগের ওপর খুব পাতলা একটা পর্দা।
খাবার প্রায় সব জায়গাতেই পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত কোনো সংকট নেই। শুধু দাম বেড়েছে। আর মানুষের চোখের ভেতরের দুশ্চিন্তাও আরও গভীর হয়েছে। শিশুদের দুধ আর কিছু বিশেষ ওষুধ পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। বেকারির সামনে এখনও লম্বা লাইন। ব্যাংকে নগদ টাকা নেই।
আর তেহরান… আজ তেহরানের বাতাস এক অদ্ভুতভাবে দমবন্ধ করা। ছবি আর ভিডিও প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। তাই গত রাতের বিশাল বিস্ফোরণের দৃশ্য আমি দেখাতে পারছি না। কিন্তু আজ সকাল প্রায় দশটা পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে খবর নিচ্ছিলাম। তখনও দুইটি তেল ডিপোতে আগুন জ্বলছিল।
আজ তেহরানের আকাশ ধূসর নয়। আকাশ কালো। শহরের চারদিক থেকে ঘন ধোঁয়া উঠছে। সেই ধোঁয়া আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। মনে হয় যেন আকাশ নিজেই ধোঁয়া আর তৈলাক্ত অন্ধকার ঝরিয়ে দিচ্ছে।
মানুষ ধীরে ধীরে যুদ্ধবিমানগুলোর শব্দের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। যারা হামলার বিরোধী ছিল, আর যারা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-র কাছে সামরিক হস্তক্ষেপ চেয়েছিল— এখন সবাই একই আকাশের নিচে বাস করছে। সেই আকাশ, যা প্রতি কয়েক ঘণ্টা পরপর যুদ্ধবিমানের শব্দে কেঁপে ওঠে।
এখন মানুষের আলাপচারিতাও বদলে গেছে। আগে কথা হতো নওরোজ বা দৈনন্দিন জীবন নিয়ে। এখন কথার বিষয় একটাই— যুদ্ধ।
স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর মধ্যে, আমার এলাকায় এক-দুটো ছাড়া প্রায় সব খবরের চ্যানেলই বন্ধ হয়ে গেছে। জ্যামিং আর ফিল্টারিং প্রতিদিন আরও বাড়ছে।
মসজিদগুলোতে ইফতার দেওয়া হয়। ইফতারের পর একজন আলেম আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেন। তিনি নেতার জন্য শোকের কথাও বলেন। তারপর রাতের খাবার পরিবেশন করা হয়। আর খাবার শেষ হতেই শুরু হয় এক অদ্ভুত দৃশ্য।
দল বেঁধে মানুষ পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে থাকে। গলি থেকে গলি। তারা স্লোগান দেয়— “মৃত্যু বিশ্ববাসীর জন্য।” এই একই শহরে মানুষ রুটির লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এই একই শহরের আকাশ ধোঁয়ায় ভরা। আর চারদিকে যুদ্ধবিমানের শব্দ।
আর আমি…
এই সব বিরোধ আর অদ্ভুত বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে— দুটি ছোট কুকুর নিয়ে তেহরানের রাস্তায় হাঁটি। আর নিজেকে মনে করিয়ে দিই—জীবন এখনও থেমে যায়নি। আমি আরও বেশি লিখছি। পুরোনো রাজনৈতিক বন্ধুদের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হচ্ছে।
আমি অদ্ভুত এক মনোযোগ নিয়ে রান্না করছি। আর ঘর গুছিয়ে রাখার ব্যাপারে যেন এক ধরনের অদ্ভুত নেশা তৈরি হয়েছে আমার।
গোলশান ফাতি
তেহরানের লেখক