রেয়ার আর্থের দখলে চীন: জিম্মি উন্নত বিশ্ব

 

বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করেছে চীন। প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের ঘোষণা—“চীন আর উন্নয়নশীল নয়, এখন আমরা উন্নত দেশ”—এর সঙ্গে মিল রেখে দেশটি একের পর এক কৌশলগত পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হলো রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল বা দুর্লভ ধাতুর রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা। এতে কার্যত উন্নত বিশ্ব অর্থনৈতিকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

রেয়ার আর্থ ছাড়া থেমে যাবে আধুনিক প্রযুক্তি

গ্যালিয়াম, জারমেনিয়াম, নিওডাইমিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, ল্যান্থানামসহ অন্তত ১৭ ধরনের ধাতু ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি কল্পনাই করা যায় না।
এই ধাতুগুলো লাগে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রিক গাড়ি, স্মার্টফোন, রোবট, এআই চিপ, এমনকি যুদ্ধবিমান তৈরিতেও।
চীনের ঘোষণার ফলে এইসব প্রযুক্তি পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

৯০ শতাংশ বাজার চীনের দখলে

বিশ্বে রেয়ার আর্থ মাইনিংয়ের ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে চীন। শুধু নিজেদের খনি নয়, আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশেও এসব খনির মালিকানা বা প্রভাব তাদের হাতে। দীর্ঘদিন ধরে সস্তা দামে প্রসেসিং করে চীন এমনভাবে বাজার দখল করেছে যে, অন্য কোনো দেশের জন্য মাইনিং বা প্রক্রিয়াজাত করা লাভজনক নয়। ফলে ইউরোপ, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র—সবাই কার্যত চীনের সাপ্লাই চেইনের ওপর নির্ভরশীল।

আমেরিকার পাল্টা পদক্ষেপ

চীনের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র এটিকে ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইস্যু’ হিসেবে দেখছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রেয়ার আর্থ পণ্যের ট্যারিফ ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত করেছেন।
তবে এতে তেমন লাভ হবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, রেয়ার আর্থের ঘাটতি মানেই সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে স্থবিরতা, প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যাঘাত, এবং প্রযুক্তি পণ্যের দামে উল্লম্ফন।

আলাস্কায় মাইনিং চেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্রে রেয়ার আর্থের বড় মজুদ রয়েছে আলাস্কায়। কিন্তু খনন খরচ ও পরিবেশগত বাধার কারণে তা কার্যকর করা কঠিন।
এমনকি ট্রাম্প আলাস্কা সফরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকেও সহযোগিতা চেয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে সে পরিকল্পনা এগোয়নি।
চীন এখন এতটাই এগিয়ে যে, এই ব্যবধান পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সময় লাগবে অন্তত এক দশক।

চিপ ও এআই যুদ্ধে নতুন অধ্যায়

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এখন সেমিকন্ডাক্টর ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্র উন্নত এআই চিপ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যার জবাবে চীন হুয়াওয়ের ‘এসেন্ড’ সিরিজসহ নিজস্ব এআই চিপ বাজারে এনেছে। আরও চমকপ্রদ হলো—চীন তাদের অভ্যন্তরীণ কোম্পানিগুলোকে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার না করতে নির্দেশ দিয়েছে। এর ফলে দেশটি দ্রুত ‘এআই-স্বনির্ভর’ হয়ে উঠছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধাক্কা।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া চীনের জন্য আলাদা করে কমক্ষমতার “H-20” চিপ তৈরি করেছিল। কিন্তু সেটিও রপ্তানিতে বাধা পড়ে। এখন যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা ছাড় দিলেও, চীনের নিজস্ব উৎপাদন শুরু হয়ে যাওয়ায় এনভিডিয়া কার্যত বাজার হারানোর ঝুঁকিতে আছে।

চীনের কৌশল: দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি

অর্থনীতিবিদদের মতে, চীন বহু বছর ধরেই পরিকল্পিতভাবে রেয়ার আর্থ বাজার দখল করেছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের “উন্নয়নশীল” পরিচয়ে কম প্রত্যাশা দেখিয়ে প্রকৃত সক্ষমতা লুকিয়ে রেখেছিল। এখন তারা সেই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়—

“চীন বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তির লাইফলাইন এখন তাদের হাতে।”

রেয়ার আর্থ নিয়ে চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি ভূরাজনৈতিক অস্ত্র।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এখন বুঝতে পারছে, প্রযুক্তিতে যতই এগিয়ে থাকুক, মূল উপাদান যদি এক দেশের হাতে থাকে—তবে সেই শক্তিই আসল নিয়ন্ত্রণকারী।
রেয়ার আর্থকে ঘিরে এই সংঘাতই হয়তো ভবিষ্যতের ‘নতুন ঠান্ডা যুদ্ধ’-এর সূচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *