ঢাকার ব্যস্ত কারওয়ানবাজার। সকাল থেকে রাত—মানুষের ভিড় থামে না। বাজারে মাছ, সবজি, ফল, মাংস—সবকিছুরই বেচাকেনা চলে। কিন্তু এই বাজারেই আছে এক ব্যতিক্রম গল্প। পাঁচ ভাই মিলে আট বছর ধরে গরুর মাংস বিক্রি করছেন একটু ভিন্নভাবে।
তাদের বাড়ি শরিয়তপুরে। কাজের খোঁজে ঢাকায় এসেছিলেন। শুরু করেছিলেন মাংসের দোকান। কিন্তু শুরুতেই একটা বিষয় তাদের চোখে পড়ে। বাজারে অনেক মানুষ আসে। কেউ মাংস কেনে। কেউ শুধু তাকিয়ে থাকে। দাম বেশি বলে অনেকেরই কেনার সাধ্য নেই।
এই দৃশ্য থেকেই জন্ম নেয় তাদের নতুন ভাবনা। পাঁচ ভাই মিলে ঠিক করেন, মাংস বিক্রি করবেন ছোট ছোট পরিমাণে। ১০০ গ্রাম, ২০০ গ্রাম—যতটুকু মানুষ পারে। কেউ চাইলে এক টুকরাও।
তাদের একজন বললেন, “আমাদের তো এত টাকা নেই যে মানুষের জন্য বড় কিছু করব। ভাবলাম, গরিব মানুষের জন্য যদি মাংস বিক্রি করি ছোট পরিমাণে, সেটাও তো সেবা।”
শুরুটা সহজ ছিল না। তবু তারা চালিয়ে গেছেন। এখন আট বছর হয়ে গেছে। ক্রেতাদের অনেকেই দিনমজুর। কেউ রিকশাচালক। কেউ বাজারের শ্রমিক। অনেকে এসে বলেন, “ভাই, ১০০ গ্রাম দেন।” কেউ বলেন, “দুইশ গ্রাম দিলেই হবে।” দোকানিরা হাসিমুখে দেন।
তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। পাঁচ ভাই বললেন, প্রথম দিকে কিছু লাভ হতো। কিন্তু পরে তারা দেখলেন, অনেক মানুষ আছে যারা ১০০ গ্রাম মাংসও কিনতে পারে না। দূর থেকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে। তখন তারা নিজেরাই তাদেরকে ডাকেন। কখনো দুই টুকরা মাংস। কখনো একটু চর্বি। কখনো তিন টুকরা। সবই ফ্রি।
“এতে লাভ কমে যায়,” বললেন তাদের একজন। “কখনো কখনো সমান সমান হয়ে যায়। তবু আফসোস নেই। লাভই সব না। গরিব মানুষ যেন একটু মাংস খেতে পারে, সেটাই বড়।” তাদের হিসাবে, এখনো প্রতিদিন পাঁচ-ছয়জন মানুষকে তারা বিনা দামে মাংস দেন।
তাদের যুক্তি সহজ।
“ফ্রি দিলেও লস হয় না,” বললেন এক ভাই। “যে মানুষটা খেয়ে শান্তি পায়, সেই শান্তিই আমাদের লাভ। এটাকেই আমরা সওয়াব মনে করি।”
কাওরানবাজারের অনেক নিয়মিত ক্রেতা তাদের চেনেন। ছোট পরিমাণে মাংস বিক্রি করার কারণে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এটি বড় সুবিধা হয়েছে বলে জানান তারা।
বাজারের ভিড়ে এই গল্প খুব ছোট। কিন্তু মানুষের মানবতার গল্প কখনো ছোট হয় না। পাঁচ ভাইয়ের দোকানে মাংস হয়তো কম। কিন্তু মানুষের প্রতি মমতা—সেটা বেশ বড়। এ কারণেই কারওয়ানবাজারের ব্যস্ততার মাঝেও তাদের গল্প আলাদা করে চোখে পড়ে।