ইরান যুদ্ধ : তেল–গ্যাসের পর লক্ষ্য কি পানির অবকাঠামো?

পারস্য উপসাগর অঞ্চলের চলমান উত্তেজনা এখন নতুন এক আশঙ্কা তৈরি করেছে—পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলার পর এবার জলবিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) শোধনাগারগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা। এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের পানীয় জলের প্রধান উৎসই এসব শোধনাগারগুলো ।

গত ৮ মার্চ বাহরাইন অভিযোগ করে, একটি ড্রোন হামলায় তাদের একটি জলবিশুদ্ধকরণ শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও পানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবু ঘটনাটি উপসাগরীয় অঞ্চলের পানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এর একদিন আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দাবি করেন, মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের কেশম দ্বীপের একটি জলবিশুদ্ধকরণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত ৩০টি গ্রামের পানির সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। তিনি বলেন, অবকাঠামোতে হামলা “বিপজ্জনক নজির” তৈরি করছে।

পারস্য সাগর ঘিরে থাকা দেশগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। এখানে প্রাকৃতিক নদী বা হ্রদ প্রায় নেই। ফলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধ করে পানীয় জল উৎপাদনের ওপরই নির্ভর করতে হয়।

গবেষণা সংস্থা গালফ রিসার্চ সেন্টার–এর তথ্য অনুযায়ী:

  • বাহরাইন: পানীয় জলের প্রায় ৯৫% আসে জলবিশুদ্ধকরণ শোধনাগার থেকে
  • কুয়েত: প্রায় ৯০%
  • ওমান: ৮৬%
  • সৌদি আরব: প্রায় ৭০%
  • সংযুক্ত আরব আমিরাত: প্রায় ৪২%

কাতারের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা প্রায় পুরোপুরি।

পারস্য উপসাগরের উপকূলে ৪০০টিরও বেশি জলবিশুদ্ধকরণ শোধনাগার রয়েছে। এগুলো প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ঘনমিটার পানি উৎপাদন করে, যা কোটি মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণ করে।

জলবিশুদ্ধকরণ একটি শক্তি-নির্ভর প্রযুক্তি। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি থেকে পানীয় জল তৈরি করতে উচ্চচাপ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়। এজন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগে।

মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ জলবিশুদ্ধকরণ শোধনাগারের বিদ্যুৎ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল থেকে। ফলে তেল–গ্যাস স্থাপনায় হামলা হলে অনেক সময় পানির উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় এর পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মার্কাস কিং বলেন, পানি সরবরাহে আঘাত হানলে সামরিক প্রভাবের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি হতে পারে।

যুদ্ধের সময় বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলা আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী এসব অবকাঠামো রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তবে ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির আছে। উপসাগরীয় যুদ্ধ চলাকালে ইরাক কুয়েতের বেশিরভাগ জলবিশুদ্ধকরণ কারখানা ধ্বংস করে দেয় এবং বিপুল তেল উপসাগরে ফেলে পরিবেশ ও পানি সরবরাহে বড় ক্ষতি করে।

পানি–সংঘাত নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক ইনস্টিটিউট–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা পিটার গ্লিক সতর্ক করে বলেন, এসব স্থাপনা যদি ধারাবাহিকভাবে আক্রমণের লক্ষ্য হয়, তাহলে পুরো অঞ্চলে মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।

সিআইএ অনেক আগেই সতর্ক করেছিল, জলবিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সৌদি আরব, কুয়েত বা বাহরাইনের মতো দেশে দ্রুত জাতীয় সংকট দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দেশগুলোর অনেকের কাছেই দীর্ঘমেয়াদি পানির মজুদ খুব কম। ফলে সরবরাহ বন্ধ হলে কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলো জরুরি পরিকল্পনা নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ছোট, বিকল্প জলবিশুদ্ধকরণ শোধনাগার চালু করা
  • পাইপলাইনে থাকা পানি কৌশলগত মজুদ হিসেবে ব্যবহার
  • ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে পানি উত্তোলনের প্রস্তুতি
  • দৈনিক পানির ব্যবহার কমানোর পরিকল্পনা

কিছু দেশে দৈনিক পানির বরাদ্দ ৩৫০–৫৫০ লিটার থেকে কমিয়ে প্রায় ১৮০ লিটারে নামিয়ে আনার বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের ঝুঁকির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় আগামী দশকগুলোতে বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। এতে পানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে।

গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট–এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে পানি–সংকটপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও কাতার রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি পানির অবকাঠামো এখন কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের উত্তেজনা যদি বাড়তে থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে “জল নিরাপত্তা” ভবিষ্যতের অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

কারণ, এই অঞ্চলে পানি শুধু একটি সম্পদ নয়—এটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভিত্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *