যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ কমান্ডের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে “মাদক পাচারকারী” নৌযান লক্ষ্য করে চালানো বিমান হামলায় কমপক্ষে ১৫৭ জন নিহত হয়েছেন। মার্কিন কর্তৃপক্ষ এসব হামলাকে “অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার”-এর অংশ হিসেবে বর্ণনা করলেও মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা একে সরাসরি “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড” বলে অভিহিত করেছেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো ক্যারিবীয় সাগরে একটি ভেনেজুয়েলান নৌযানে বিমান হামলার ঘোষণা দেন। ওই হামলায় নৌযানটিতে থাকা ১১ জনই নিহত হন। সে সময় ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে হামলার ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেন, এটি মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ।
পরবর্তীতে এই অভিযানের পরিসর দ্রুত বাড়তে থাকে। অক্টোবরে হামলার ক্ষেত্র প্রশান্ত মহাসাগরে সম্প্রসারিত হয় এবং নভেম্বরে “অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার” আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৫টি হামলায় ৪৬টি নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি ক্যারিবীয় সাগরে, ৩০টি প্রশান্ত মহাসাগরে এবং ২টি অজ্ঞাত স্থানে সংঘটিত হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং সেন্টার ফর ইকোনমিক এন্ড পলিসি রিসার্চ–এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। CEPR-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় সাগরে ১৪টি এবং প্রশান্ত মহাসাগরে অন্তত ২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় কোনো বিচারপ্রক্রিয়া ছাড়াই অন্তত ১৫৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও এসব হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা যুদ্ধবিধি এবং মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, নিহতরা সবাই “নারকো-সন্ত্রাসবাদী” বা মাদক কার্টেলের সদস্য। তবে এই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস–এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিহতদের অনেকেই ছিলেন সাধারণ জেলে বা দরিদ্র মৎস্যজীবী।
২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরের এক হামলায় নিহত এক কলম্বিয়ানকে মার্কিন কর্তৃপক্ষ মাদক পাচারকারী বলে দাবি করলেও তার পরিবার জানায়, তিনি ছিলেন একজন সাধারণ জেলে। এ বিষয়ে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বলেন, নিহতদের একজন ছিলেন কলম্বিয়ার জেলে।
এছাড়া নিউ ইয়র্ক টাইমস–এর প্রতিবেদনে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর একটি পরিবারের দাবি উঠে আসে, তাদের আত্মীয় একজন সাধারণ জেলে ছিলেন, যিনি মার্কিন হামলায় নিহত হন।
২০২৫ সালের নভেম্বরে দি ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক প্রতিবেদনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সেখানে বলা হয়, প্রথম হামলায় বেঁচে যাওয়া দুইজনকে পরবর্তী “ডাবল ট্যাপ” হামলায় হত্যা করা হয়।
প্রতিবেদনে দুইজন অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়, প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ মৌখিকভাবে SEAL টিম সিক্সকে “কোনো বেঁচে থাকা যেন না থাকে” নির্দেশ দিয়েছিলেন।
যদিও পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল এই অভিযোগ “সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তবে CNN–এর প্রতিবেদনে একই ধরনের তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে পাঁচজন অজ্ঞাতনামা মার্কিন কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমস– কে জানান, লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের নির্দেশ থাকলেও বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই হামলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ফেডারেল মামলা দায়ের করা হয়। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন, সেটন হল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেন্টার ফর কন্সটিটিিউশনাল রাইটস–এর আইনজীবীরা নিহতদের পরিবারের পক্ষে মামলাটি করেন।
সেটন হল ল স্কুলের অধ্যাপক জোনাথন হাফেত্জ বলেন, “এটি অভূতপূর্ব। মার্কিন ইতিহাসে সরকার কখনো এ ধরনের ক্ষমতা দাবি করেনি। এটি স্পষ্ট অবৈধ হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ। আন্তর্জাতিক জলসীমায় মানুষ হত্যার অধিকার দাবি করা হচ্ছে।”
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো বারবার অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার দেশে রেজিম পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলা উভয় দেশই এসব হামলাকে “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবরের এক হামলায় ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে লেগে থাকা একজন বেঁচে থাকা ব্যক্তিকে দেখা যায়। মেক্সিকান নৌবাহিনী (SEMAR) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার অভিযান চালালেও ৯৬ ঘণ্টা অনুসন্ধানের পরও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।