এক সপ্তাহে সোনার বাজারে বড় পতন

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রায় ১০.৫ শতাংশ কমে গেছে। দাম নেমে এসেছে প্রায় ৪,৪৯০ ডলারে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এত বড় সাপ্তাহিক পতন সর্বশেষ ঘটেছিল ১৯৮২ সালে—প্রায় চার দশক আগে।

ইতিহাস বলছে, সোনার বড় ধরনের দরপতনের পেছনে সাধারণত শক্ত অর্থনৈতিক কারণ থাকে। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। এতে বিনিয়োগকারীরা সোনা ছেড়ে সুদভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকেন। একইভাবে, ২০১৩ সালে ‘টেপারিং’ সংকেত এবং ২০২২ সালে দ্রুত সুদহার বৃদ্ধির সময়ও সোনার বাজারে চাপ তৈরি হয়েছিল।

তবে ২০২৬ সালের মার্চের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, বিশেষ করে ইসরায়েল ও ইরান-এর মধ্যে উত্তেজনা, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিভিন্ন তেল শোধনাগার ও গ্যাস স্থাপনায় হামলার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে। এতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে।

সাধারণ অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, এ ধরনের অনিশ্চয়তার সময়ে সোনার দাম বাড়ার কথা। কারণ, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকে থাকেন। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে উল্টো প্রবণতা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।

প্রথমত, শক্তিশালী মার্কিন ডলার। ডলার শক্তিশালী হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা বিনিয়োগকারীদের জন্য সোনা কেনা বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ফলে চাহিদা কমেছে।

দ্বিতীয়ত, তেলের বাজারে বড় ধরনের লোকসান। অনেক কমোডিটি ফান্ড তেলের দামে ওঠানামার কারণে মার্জিন কলের মুখে পড়েছে। সেই ক্ষতি পোষাতে তারা সোনা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে।

তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে শিকাগো মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জ (CME)-এর মার্জিন রিকোয়ারমেন্ট বৃদ্ধি। এর ফলে লিভারেজ নিয়ে ট্রেড করা বিনিয়োগকারীরা বাধ্য হয়ে তাদের পজিশন দ্রুত বন্ধ করে দেন। এতে বাজারে বিক্রির চাপ আরও বেড়ে যায়।

তবে ইতিহাসে একটি ভিন্ন দিকও রয়েছে। ১৯৮২ সালের বড় পতনের পরবর্তী ১২ মাসে সোনার দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। যদিও অতীতের পুনরাবৃত্তির কোনো নিশ্চয়তা নেই, তবু এই ধরণের আকস্মিক পতন ভবিষ্যৎ বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের মত, সোনার বাজার এখন এক ধরনের ‘ক্রসকারেন্ট’-এর মধ্যে রয়েছে—একদিকে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি, অন্যদিকে আর্থিক বাজারের চাপ। ফলে স্বল্পমেয়াদে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *