হরমুজ প্রণালী বন্ধ: বিশ্ব অর্থনীতিতে ভূমিকম্প

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়েছে—যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল রপ্তানি হয়।

এর সরাসরি প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে তীব্র ওঠানামা দেখা গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার থেকে সর্বোচ্চ ১২০ ডলারে পৌঁছায়, পরে তা ৯০ ডলারের ওপরে স্থিতিশীল হয়।

এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা “অকল্পনীয়” বলে বর্ণনা করেছেন। তবে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য এটি কোনো নতুন বা অজানা বাস্তবতা নয়—বরং ক্রমশ গভীরতর সংকট।

সংকটের সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়ছে জ্বালানি-নির্ভর নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।

নেপাল: রান্নার গ্যাস সংগ্রহের জন্য সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে।

শ্রীলঙ্কা: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সপ্তাহে একদিন বাড়তি—(বুধবার)—সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্প কারখানাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তান: শিক্ষা খাতেও প্রভাব পড়েছে। স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে ক্লাস চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে ২০২২ সালের জ্বালানি সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারা দেশটি নতুন ধাক্কায় আবারও চাপে পড়েছে।

এই পরিস্থিতি অনেকটা ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানি সংকটের পুনরাবৃত্তি। তখন ইউরোপীয় দেশগুলো বিপুল ভর্তুকি দিয়ে নিজেদের জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখে, ফলে বৈশ্বিক চাহিদা অপরিবর্তিত থাকায় দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকে।

কিন্তু সীমিত রিজার্ভ ও দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো সেই ধাক্কা সহ্য করতে পারেনি। শ্রীলঙ্কা বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ শেষ করে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। পাকিস্তান ব্যালেন্স অব পেমেন্টস সংকটে পড়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর সহায়তা নিতে বাধ্য হয় এবং আমদানি কমিয়ে দেয়।

ব্রিটিশ সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট একটি সূচক তৈরি করেছে, যেখানে দেশগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে তিনটি মানদণ্ডে:

১. মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা
২. জ্বালানি সরবরাহের বৈচিত্র্য
৩. আর্থিক সক্ষমতা (বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ও ঋণের পরিমাণ)

এই সূচকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • পাকিস্তান: দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি আমদানি নির্ভর। বিশেষ করে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে নতুন জ্বালানি ধাক্কা অর্থনীতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
  • মিশর ও জর্ডন: উচ্চ আমদানি নির্ভরতা ও সীমিত আর্থিক সক্ষমতা এই দুই দেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
  • শ্রীলঙ্কা: সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার পথে থাকা দেশটি নতুন করে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর হিসাবে, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বাড়লে এবং তা যদি এক বছর ধরে স্থায়ী হয়, তাহলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ০.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.২ শতাংশ কমে যেতে পারে।

তবে দরিদ্র দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রভাব আরও তীব্র। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ সার রপ্তানি হয়। সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদনে প্রভাব পড়বে, বাড়বে খাদ্য সংকট।

পরিস্থিতির বৈপরীত্য এখানেই—সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর মতো গল্ফ দেশগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের রয়েছে বিপুল আর্থিক রিজার্ভ, বিকল্প রপ্তানি অবকাঠামো এবং উচ্চ তেলের দাম থেকে বাড়তি আয়।

অন্যদিকে জ্বালানি আমদানি নির্ভর দরিদ্র দেশগুলো দ্বিমুখী চাপে পড়েছে—একদিকে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে পারছে না; বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ধীর করে দিচ্ছে।

ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম, বাজারের আস্থা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক-এর বসন্তকালীন বৈঠকে নতুন অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে এই সংকটের পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তৃতীয় গল্ফ যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি দরিদ্র বিশ্বের অর্থনীতির ওপর নতুন এক বড় ধাক্কা। যেসব দেশের বিকল্প জ্বালানি উৎস সীমিত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কম এবং ঋণের চাপ বেশি—তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এখন বড় প্রশ্ন—আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে এই “অকল্পনীয়” সংকট থেকে দরিদ্র দেশগুলোকে রক্ষা করবে?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *