ইতিহাস বদলাল ইংল্যান্ডের প্রাচীন ধর্মীয় কেন্দ্র ক্যান্টারবারিতে। সারাহ এলিসাবেথ মুলালি চার্চ অব ইংল্যান্ডের ১০৬তম আর্চবিশপ হিসেবে অভিষিক্ত হলেন। তিনিই প্রথম নারী, যিনি এই পদে বসেন। ১,৪০০ বছরের ধারায় এটি এক বড় পরিবর্তন।
অভিষেক অনুষ্ঠিত হয় ক্যান্টারবারি ক্যাথিড্রাল-এ। ঐতিহ্য অনুযায়ী পশ্চিম দরজায় করাঘাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার সম্পন্ন হয়।
এই পদটির সূচনা ৫৯৭ সালে। তখন সেন্ট অগাস্টিন ইংল্যান্ডে খ্রিস্টধর্ম প্রচার শুরু করেন। সেই ধারারই বর্তমান প্রধান এখন মুলালি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রিন্স উইলিয়াম, প্রিন্সেস অব ওয়েলস ক্যাথরিন, এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। এছাড়া আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নারী বিশপরা অংশ নেন।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৫ মিলিয়ন অনুসারীর অ্যাংলিকান কমিউনিয়ন-এর জন্য এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। অনুষ্ঠানে একাধিক ভাষায় প্রার্থনা করা হয়। এতে বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্ব তুলে ধরা হয়।
প্রথম বক্তব্যে মুলালি বলেন, তিনি কখনো ভাবেননি এই দায়িত্ব তাঁর কাছে আসবে। তিনি এটিকে ঈশ্বরের আহ্বান হিসেবে দেখেন।
মুলালির জীবনযাত্রা আলাদা ধরণের। তিনি পেশা শুরু করেন নার্স হিসেবে। লন্ডনের সেন্ট থমাস’ হাসপাতাল থেকে প্রশিক্ষণ নেন। পরে জাতীয় স্বাস্থ্যখাতে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন।
১৯৯৯ সালে তিনি ইংল্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ চিফ নার্সিং অফিসার হন। ২০০৫ সালে ডেম কমান্ডার অব দি অর্ডার অব দি ব্রিটিশ এম্পায়ার (DBE) খেতাবে ভূষিত হন।।
৪০ বছর বয়সে তিনি ধর্মীয় জীবনে প্রবেশ করেন। পরে দ্রুত নেতৃত্বে উঠে আসেন। ২০১৫ সালে বিশপ হন। ২০১৮ সালে লন্ডনের বিশপ হিসেবে দায়িত্ব নেন। এটি চার্চের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ।
এই অভিষেক সবাই সমর্থন করেনি। গ্লোবাল ফেলোশিপ অব কনফেসিং অ্যাংলিকানস আপত্তি জানিয়েছে। তাদের মতে, কিছু সামাজিক বিষয়ে মুলালির অবস্থান ঐতিহ্যবাহী মতের বাইরে।
বিশেষ করে সমকামী সম্পর্ক ও বিবাহ নিয়ে তাঁর অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার কিছু চার্চ এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
তবে সমর্থকরা বলছেন, এটি সমতার পথে বড় অগ্রগতি। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নারী নেতৃত্বের স্বীকৃতি এটি। কেনিয়ার প্রথম নারী অ্যাংলিকান বিশপ এমিলি ওনিয়াঙ্গো বলেন, “অনেকে ভাবতেই পারিনি আমাদের জীবদ্দশায় একজন নারী এই পদে নির্বাচিত হবেন । এটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।”
মুলালি দায়িত্ব নিলেন কঠিন সময়ে। তাঁর পূর্বসূরি জাস্টিন ওয়েলবি ২০২৪ সালে পদত্যাগ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা ছিল যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত ইস্যু সামলাতে ব্যর্থতার অভিযোগে।
চার্চ অব ইংল্যান্ডে বর্তমানে অনুসারী কমছে। আর্থিক চাপও রয়েছে। ভেতরে মতভেদও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মুলালির প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এই পরিস্থিতিতে কাজে লাগতে পারে। স্বাস্থ্যখাতে তাঁর দীর্ঘ কাজ তাঁকে সংকট ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করেছে।
অভিষেকের আগে তিনি লন্ডন থেকে ক্যান্টারবারি পর্যন্ত প্রায় ৮৭ মাইল হাঁটেন। — জিওফ্রে চসারের দ্য ক্যান্টারবারি টেলস-এর সেই পথ। অ্যানানসিয়েশন ডে-তে অভিষেক — যেদিন মেরিকে যীশুর মা হিসেবে ডাকা হয়েছিল। প্রতীকী দিন, প্রতীকী যাত্রা। এই দিনটি খ্রিস্টধর্মে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
মুলালি বলেছেন, তিনি এমন নেতৃত্ব দিতে চান যা সবার জন্য উন্মুক্ত হবে। তিনি বিভিন্ন মত ও ঐতিহ্যকে একসঙ্গে নিয়ে এগোতে চান।
ক্যান্টারবারির এই অভিষেক শুধু একটি নিয়োগ নয়। এটি একটি প্রতীক। ধর্মীয় নেতৃত্বে পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
১,৪০০ বছর পর, ক্যান্টারবারি ক্যাথিড্রালের দেয়ালে এখন একজন নারীর ছায়া পড়বে — সারাহ মুলালির। ইতিহাস বলছে, এটি শুধু একটি অভিষেক নয়; এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এটি ভবিষ্যতের পথও বদলে দিতে পারে।