বাংলার বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও শিল্প-নির্দেশক তরুণ ঘোষ আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
১৯৫৩ সালের নভেম্বরে রাজবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন তরুণ ঘোষ। শৈশব থেকেই তিনি শিল্পচর্চার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেকে একজন বহুমাত্রিক শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৭৯ সালে তিনি রাজশাহী আর্ট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই প্রতিষ্ঠানই পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে রূপান্তরিত হয়। শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিল্পচর্চায় অনুপ্রাণিত করেন।
১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের বরোদায় মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘ফোক পেইন্টিং রিসার্চ অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন প্রোগ্রাম’-এ কাজ করেন। এই সময়ে তিনি উপমহাদেশের লোকশিল্প নিয়ে গভীর গবেষণা করেন। তাঁর শিল্পচিন্তায় এই অভিজ্ঞতার প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
চিত্রকলার পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ‘কিত্তনখোলা’ চলচ্চিত্রে শিল্প নির্দেশনার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া ‘মাটির ময়না’, ‘নরসুন্দর’, ‘চন্দ্রাবতী কথা’ এবং সর্বশেষ ‘সখী রঙ্গমালা’ চলচ্চিত্রে তিনি শিল্প-নির্দেশকের দায়িত্ব পালন করেন।
তরুণ ঘোষের চিত্রকর্মে বাংলার লোকঐতিহ্য, মিথ ও ইতিহাস নতুনভাবে উঠে এসেছে। তিনি আধুনিক শিল্পভাষায় ঐতিহ্যকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ‘বেহুলা’ সিরিজ বিশেষভাবে প্রশংসিত। এই সিরিজে লোককথার চরিত্রকে নতুন দৃষ্টিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বড় ক্যানভাস সিরিজ তাঁর শিল্পজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এছাড়া পাখি, প্রকৃতি, প্রতিকৃতি এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির নানা প্রকাশ তাঁর কাজে দেখা যায়।
শিল্পী তরুণ ঘোষের মৃত্যুতে দেশের শিল্পাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীরা তাঁর অবদান স্মরণ করছেন। তাঁর সৃষ্টিকর্মই তাঁকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।