মানব সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ খুঁজে ফিরেছে অমরত্বের রহস্য। চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং পান করতেন পারদ মিশ্রিত পানীয়, মধ্যযুগের ইউরোপে খোঁজা হতো “জীবনের ঝরনা”—কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখন দেখাচ্ছে, দীর্ঘায়ুর প্রকৃত চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের শরীরের কোষের ভেতরে, বিশেষ করে সেই ছোট্ট শক্তিকেন্দ্রগুলোতে যাদের বলা হয় মাইটোকন্ড্রিয়া।
ফেব্রুয়ারিতে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দীর্ঘায়ু গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মাইটোকন্ড্রিয়া। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লেয়োনার্ড ডেভিস স্কুল অব জেরোন্টোলজির ডিন পিনচাস কোহেন মন্তব্য করেন, “আমি মাইটোকন্ড্রিয়াকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে দেখে অভিযোগ করছি না, কারণ আমি মনে করি এটি গুরুত্বপূর্ণ… কিন্তু আমি সত্যিই ব্যাখ্যা করতে পারছি না যে এটি কীভাবে ঘটল।”
মাইটোকন্ড্রিয়া: কোষের শক্তিকেন্দ্র
মাইটোকন্ড্রিয়া আমাদের কোষের “শক্তি কারখানা”। এগুলো শরীরের প্রতিটি কোষে থাকে এবং এটিপি (ATP) নামক অণু উৎপাদন করে, যা শরীরের সব কার্যক্রমের জন্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মাইটোকন্ড্রিয়াগুলোর কার্যকারিতা কমতে থাকে।
কোহেন ব্যাখ্যা করেন, “মাইটোকন্ড্রিয়া কোষের অন্যান্য অংশের চেয়ে আগেই হাল ছেড়ে দেয়, কারণ এগুলো যে পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যায় তাতে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। এগুলো কোষীয় অকার্যকারিতার কয়লাখনির ক্যানারি [সতর্ক সংকেত]।”
যখন মাইটোকন্ড্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন কোষে এটিপি উৎপাদন কমে যায়, বাড়তে থাকে রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিশিস (ROS) বা মুক্ত র্যাডিকেল—যা কোষের ক্ষতি করে এবং বয়সজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
বৈজ্ঞানিক ব্রেকথ্রু: COX7RP প্রোটিন আবিষ্কার
গত বছরের শেষের দিকে জাপানের টোকিও মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট ফর জেরিয়াট্রিকস অ্যান্ড জেরোন্টোলজির একটি গবেষণা দল উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার করেছে। তারা দেখেছেন যে COX7RP নামক একটি মাইটোকন্ড্রিয়াল প্রোটিন দীর্ঘায়ুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষকরা জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড ইদুর তৈরি করেন যারা সারাজীবন উচ্চমাত্রায় COX7RP প্রোটিন উৎপাদন করতে পারে। ফলাফল চমৎকার ছিল:
– গড়ে ৬.৬% বেশি বাঁচল ইঞ্জিনিয়ার্ড ইদুরগুলো
– উন্নত গ্লুকোজ হোমিওস্টাসিস এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা
– কম রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরল
– ভালো পেশী সহনশীলতা এবং লিভারে কম চর্বি জমা
গবেষণার প্রধান ড. সাতোশি ইনোয়ে বলেন, “আমাদের গবেষণা বয়স বিরোধী কার্যক্রম এবং দীর্ঘায়ুর নতুন মাইটোকন্ড্রিয়াল প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছে এবং স্বাস্থ্যকাল বাড়ানো ও আয়ু বাড়ানোর কৌশলে নতুন অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে।”
কীভাবে কাজ করে এই প্রক্রিয়া?
COX7RP প্রোটিন মাইটোকন্ড্রিয়ার শ্বাসনালী সুপারকমপ্লেক্স গঠনে সাহায্য করে। এটি কোষে এটিপি উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ইদুরগুলোর শ্বেত চর্বি টিস্যুতে:
– বেশি NAD+ কোএনজাইম (যা কোষীয় বৃদ্ধায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত)
– কম ROS (মুক্ত র্যাডিকেল)
– কম β-গ্যালাক্টোসিডেজ (কোষীয় বৃদ্ধায়নের মার্কার)
এছাড়া, বয়সজনিত প্রদাহজনিত জিনের ক্রিয়াকলাপও কমে গিয়েছিল।
মাইটোকন্ড্রিয়ার বহুমুখী ভূমিকা
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখাচ্ছে, মাইটোকন্ড্রিয়া শুধু শক্তি উৎপাদন করে না, বরং বয়সজনিত প্রক্রিয়াগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। এটি সংযুক্ত করেছে:
– জিনোমিক অস্থিরতা
– টেলোমিয়ার সংক্ষিপ্ততা
– কোষীয় সেনেসেন্স (বৃদ্ধ কোষ)
– দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ
একটি পর্যালোচনা নিবন্ধে লেখকরা মন্তব্য করেন, “বয়স্ক কোষ, টিস্যু এবং অঙ্গ পুনরুজ্জীবিত করতে এবং সুস্থ দীর্ঘায়ু বাড়াতে মাইটোকন্ড্রিয়াল ফাংশন পুনরুদ্ধারের পথ আলোকিত করেছে।”
থেরাপিউটিক সম্ভাবনা
বৈজ্ঞানিকরা এখন বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন মাইটোকন্ড্রিয়াল ফাংশন উন্নত করতে:
১. সেনোলিটিক্স: যা “জোম্বি কোষ” বা সেনেসেন্ট কোষ ধ্বংস করে। কোয়েরসেটিন ও ডাসাটিনিবের মতো যৌগ দেখা গেছে বয়স্ক মানুষের কোষীয় কার্যক্রম উন্নত করে।
২. NAD+ বুস্টার: বয়সের সঙ্গে NAD+ স্তর কমে যায়, যা মাইটোকন্ড্রিয়া ও নিউক্লিয়াসের মধ্যে যোগাযোগ বিঘ্নিত করে। এনএমএন ও নিকোটিনামাইড রাইবোসাইডের মতো সাপ্লিমেন্ট এটি বাড়াতে পারে।
৩. মাইটোফেজি উদ্দীপক: যা ক্ষতিগ্রস্ত মাইটোকন্ড্রিয়া পরিষ্কার করে। ইউবিকুইনোল (কোএনজাইম Q10) ও পার্কিনসনের রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত পার্কিন উদ্দীপক এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।
৪. মাইটোকন্ড্রিয়া ট্রান্সপ্লান্টেশন: ক্ষতিগ্রস্ত কোষে সুস্থ মাইটোকন্ড্রিয়া স্থানান্তরের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।
ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
ড. ইনোয়ের মতে, “মাইটোকন্ড্রিয়াল শ্বাসনালী সুপারকমপ্লেক্সের সমাবেশ ও কার্যকারিতা বাড়ানোর সাপ্লিমেন্ট ও ওষুধ দীর্ঘায়ু বাড়াতে অবদান রাখতে পারে।”
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, মানুষের ওপর এখনো অনেক পরীক্ষা করতে হবে। কিন্তু এটি স্পষ্ট যে, মাইটোকন্ড্রিয়া লক্ষ্য করে চিকিৎসা বয়সজনিত রোগ যেমন ডায়াবেটিস, ডিসলিপিডেমিয়া, স্থূলতা ও নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।
হাজার বছরের খোঁজার পর মনে হচ্ছে, দীর্ঘায়ুর রহস্য কোনো বহিরাগত রসায়নে নয়, বরং আমাদের নিজেদের কোষের ভেতরে লুকিয়ে আছে। মাইটোকন্ড্রিয়ার এই গবেষণা শুধু আয়ু বাড়ানোর পথই দেখাচ্ছে না, সুস্থ জীবনের মান উন্নত করার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
—
তথ্যসূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, সায়েন্স ডেইলি, এজিং সেল জার্নাল, পিএমসি, লাইফস্প্যান.আইও