শ্রম আইনে বড় পরিবর্তন: যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর বিধান

বাংলাদেশের শিল্প খাতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কমানো এবং শ্রমিকদের অধিকার আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়া এই বিলটি এখন পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়েছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রীর পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন। এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জারি করা সংশোধনী অধ্যাদেশটি এখন আইনি ভিত্তি পেল।

নতুন আইনের অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়া সহজ করা। আগে নির্দিষ্ট শতকরা হারের জটিলতা থাকলেও এখন মাত্র ২০ জন শ্রমিক একসাথে হলেই ইউনিয়ন গঠনের আবেদন করা যাবে। এতে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার পথ সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩ দিনে উন্নীত করা হয়েছে। এতে শ্রমিকদের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য কিছুটা উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

১০০ বা তার বেশি শ্রমিক রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানে দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিক লিখিতভাবে চাইলে ভবিষ্যৎ তহবিল গঠন করা যাবে। বিকল্প হিসেবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ‘প্রগতি স্কিম’-এ যুক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

প্রথমবারের মতো শ্রম আইনে ‘যৌন হয়রানি’র সুস্পষ্ট সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারী প্রধান অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে নারী ও পুরুষের সমান কাজের জন্য অসম মজুরি দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এই আইনের আওতায় গৃহকর্মী, কৃষি শ্রমিক এবং নাবিকদের আনা হয়েছে। ফলে এসব খাতে কর্মরত শ্রমিকরাও এখন আইনি সুরক্ষা পাবেন। নাবিকদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আইনে জাতীয় সামাজিক সংলাপ ফোরাম গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে শ্রমিক, মালিক ও সরকার একসাথে নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করতে পারবে। পাশাপাশি শ্রম বিরোধ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষ গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

শ্রমিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো শ্রমিককে অন্যায়ভাবে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ করলে তা অসৎ শ্রম আচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

সরকার বলছে, এই আইন আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা ধরে রাখা সহজ হবে এবং ভবিষ্যতে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শ্রমসংক্রান্ত শর্ত পূরণেও এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আইন শুধু একটি আইনি পরিবর্তন নয়। এটি শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলনের প্রতিফলন। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক উন্নত হবে এবং দেশের প্রধান রপ্তানি খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে—স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *