জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের অর্থনীতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনায় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং প্রায় ধ্বংসের মুখে পৌঁছেছে।
মন্ত্রী বলেন, এই সময়ে দুর্নীতি, লুটপাট ও ভুল নীতির কারণে অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মতে, একসময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকারের আমলে অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় থাকলেও, পরবর্তীতে সেই অগ্রগতি অনেকটাই নষ্ট হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৪.২২ শতাংশে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৭.১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধিতেও একই ধারা দেখা গেছে। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ১০.৬৬ শতাংশ থেকে নেমে ৩.৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ৫.৭৭ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৩.৩০ শতাংশ।
মন্ত্রী জানান, শিল্প খাতের গতি কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানও সংকুচিত হয়েছে। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত চাকরি না থাকায় অনেক তরুণ কৃষিতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এতে ছদ্ম-বেকারত্ব বেড়েছে এবং শ্রমশক্তির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।
২০০১-২০০৬ সময়ে জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য থাকলেও, বর্তমানে বিনিয়োগ সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি। ফলে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশ থেকে আনতে হচ্ছে, যা বৈদেশিক খাতে চাপ সৃষ্টি করছে।
মন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলার ছিল ৬৭.২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে ১২১ টাকায় পৌঁছেছে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়েছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বড় বড় প্রকল্পে অতিমূল্যায়ন ও দুর্বল যাচাইয়ের কারণে বাজেট ঘাটতি বেড়েছে। এসব প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুফল পায়নি সাধারণ মানুষ। বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি, যা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মন্ত্রী বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থাকলেও তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। উপকারভোগী নির্বাচনে অনিয়ম ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগও তোলেন তিনি। এতে বৈষম্য আরও বেড়েছে।
ব্যাংকিং খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। ২০০৫ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩.৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.২০ শতাংশে। তার দাবি, প্রকৃত তথ্য আড়াল করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতি এখন একাধিক চাপে রয়েছে—কম প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল কর্মসংস্থান, এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি। তিনি ইঙ্গিত দেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নতুন নীতি ও কঠোর সংস্কার প্রয়োজন।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব দাবির পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য স্বাধীন তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।