রকিব হাসান — আমাদের কৈশোরের অধিপতি

 

রাত ছিলো নিঃশব্দ, ঠিক যেমন সেই রাতগুলো—যখন আমরা টর্চ হাতে বালিশের নিচে লুকিয়ে বই পড়তাম।
বাতাসে গাছের পাতা নড়ত, মনে হতো গোয়েন্দারা আবার বেরিয়েছে অভিযানে।
তিনজন ছেলেই—কিশোর, মুসা, রবিন—তাদের হাসির শব্দ যেন আজও কোথাও বেজে ওঠে।

একজন মানুষ ছিলেন—বড়ই ছাপোষা। অফিসের চাকরি ছেড়ে এক বেতনবিহীন, বেনামী, কিন্তু অগাধ দায়িত্বে ভরা ‘কল্পনার চাকরি’ নিয়েছিলেন। একটি পুরনো টাইপরাইটার আর চেয়ার-টেবিলই ছিল তাঁর জগৎ। বাইরের পৃথিবী তিনি চোখে দেখেননি, কিন্তু কলমের জোরে ঘুরে এসেছেন আমাজনের অরণ্য, আফ্রিকার সাভানা, কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের নারকেল-ছাওয়া দ্বীপপুঞ্জ।

তিনি রকিব হাসান।

ইন্টারনেট ছিল না, সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, ছিল না লাইক বা শেয়ার—
তবু তাঁর লেখা ছড়িয়ে পড়েছিল স্কুলের বেঞ্চে, লাইব্রেরির শেলফে, বন্ধুদের মধ্যে হাতবদল হওয়া এক পাতলা বইয়ের পাতায়।
আজও সেই পাতার গন্ধে লেগে আছে কৈশোরের নস্টালজিয়া।

তিনি ছিলেন তিন গোয়েন্দার সেই নিঃশব্দ জাদুকর, যিনি নীরবে, বিনা প্রচারণায়, আমাদের কৈশোরের জানালার কাচে রহস্যের রঙ লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর মুখ কেমন ছিল, কণ্ঠস্বর কেমন—তা আমরা কেউ হয়তো জানি না। কিন্তু তাঁর গল্পের ছায়া আজও মাথার ভেতর ঘোরে।

রবিন, কিশোর, মুসা—এই তিন বন্ধুর সঙ্গে আমরা যে কত অভিযান পাড়ি দিয়েছি, কত ‘গোপন গুহা’র দরজা খুলেছি, আর কত রাতের ঘুম হারিয়েছি, তার হিসেব কেউ রাখে না। তাঁর শব্দে পকেটভর্তি টর্চলাইট, সিগন্যাল লাইট, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি আর লাইব্রেরির পুরোনো বইয়ের গন্ধ—সব একসাথে মিলেমিশে বানিয়েছে আমাদের কৈশোরের মানচিত্র।

তাঁর গল্প আমাদের শিখিয়েছিল—একটি টর্চলাইট, একখানা নোটবুক আর তিন বন্ধুর বন্ধুত্বই যথেষ্ট পৃথিবী জয় করার জন্য। তিনি হয়তো খুব ধনী ছিলেন না, কিন্তু আমাদের মনে তিনি রেখে গেছেন এক অমূল্য ধনভাণ্ডার—যে বয়সে আমরা বিশ্বাস করতাম, জীবনটা বুঝি সত্যিই এক অ্যাডভেঞ্চার!

আজ আমরা বড় হয়ে গেছি, জীবন বিষণ্ণতা নিয়ে আসে। তবুও মাঝে মাঝে রাতের নরম আলোয়, বুকশেলফের ধুলোমাখা এক কোণে তাকাই—একটি পুরোনো বই এখনও হাসে, মলাটে ঝলমল করে একটি নাম: তিন গোয়েন্দা। আর তার পিছনে আপনার ছায়া, যিনি আমাদের শেখালেন—অন্ধকারেও টর্চ জ্বেলে সত্য খুঁজে নিতে হয়।

রকিব হাসান হয়তো চলে গেছেন কালান্তরে, কিন্তু তাঁর গল্পের পাহাড়ি গুহা, রহস্যময় দ্বীপ, কিংবা কুয়াশাচ্ছন্ন পরিত্যক্ত বাড়ি আজও জীবন্ত আছে। তাঁর হাতে গড়া রবিনের হাসি, মুসার মজার বুলি, আর কিশোরের ধাঁধাঁর চোখ আজও আমাদের মধ্যে বেঁচে আছে।

তাঁর প্রতিটি ‘তিন গোয়েন্দা’ বইয়ের প্রথম পাতায় আজও লুকিয়ে আছে আমাদের কৈশোরের হৃদস্পন্দন। তিনি চলে যাননি, তিনি রয়ে গেছেন প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি কৈশোরে, যেখানেই কেউ বই খুলে বলে, “আজ রাতের অভিযান শুরু হোক।”

শুভ যাত্রা, প্রিয় রকিব হাসান। আপনি চলে গেলেও, আপনার কলমের জগতে আমাদের ভেতরের সেই কিশোরেরা আজও বেঁচে আছে, যেখানে রহস্যের কোনো শেষ নেই।

আপনার প্রতি আমাদের অশেষ শ্রদ্ধা, আর একফোঁটা নিঃশব্দ অশ্রু—

ধন্যবাদ, রকিব হাসান। আমাদের কিশোর বেলাকে সুন্দর করে তোলার জন্য।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *