নতুন প্রযুক্তি ও পুরনো প্রতিশ্রুতিতে সিটিসেলের প্রত্যাবর্তন

 

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ইতিহাসে সিটিসেল নামটি এক সময় ছিল এক অনন্য অধ্যায়। ১৯৯৩ সালে দেশটির প্রথম মোবাইল ফোন অপারেটর হিসেবে যাত্রা শুরু করা সিটিসেল ছিল একমাত্র সিডিএমএ (CDMA) প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানি। তখন গ্রামীণফোন, বাংলালিংক কিংবা রবি বাজারে আসেনি। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে “সিটিসেল কানেকশন মানেই স্ট্যাটাস”—এই ধারণা ঢাকার মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

তবে সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে ব্যবহারকারীর চাহিদা। জিএসএম (GSM) প্রযুক্তি বাজারে প্রবেশ করার পর সিডিএমএ-নির্ভর সিটিসেল ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে। অবশেষে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নির্দেশে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় কোম্পানিটি।

কিন্তু দীর্ঘ নয় বছর পর, আবারও আলোচনায় ফিরে এসেছে সিটিসেল—নতুন রূপে, নতুন প্রতিশ্রুতিতে।

নতুন সূচনা: সিটিসেলের প্রত্যাবর্তন

সিটিসেলের মূল প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক টেলিকম জানিয়েছে, তারা আবারও দেশের মোবাইল ফোন বাজারে প্রবেশ করছে, এবার সম্পূর্ণভাবে জিএসএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে। অর্থাৎ, এবার সিটিসেলের সিম যেকোনো মোবাইল ফোনে ব্যবহারযোগ্য হবে—যা তাদের পূর্ববর্তী সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেবে।

প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন,

“আমরা চাই ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে ভালো সেবা পাক। এজন্যই আমরা বাজারে ফিরছি নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক টাওয়ার কাভারেজ, এবং সাশ্রয়ী মূল্যের ইন্টারনেট প্যাকেজ নিয়ে।”

কলরেট মাত্র ২৫ পয়সা: বাজারে নেমে আসবে প্রতিযোগিতা

বর্তমানে গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, ও টেলিটকের মতো অপারেটররা গড়ে মিনিটে ৫০ থেকে ৭০ পয়সা পর্যন্ত কলরেট নিচ্ছে। সেখানে সিটিসেলের ঘোষণা—মাত্র ২৫ পয়সা প্রতি মিনিট—টেলিকম বাজারে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এত কম কলরেট টেকসইভাবে বজায় রাখা কঠিন হবে যদি না প্রতিষ্ঠানটি বৃহৎ পরিসরে গ্রাহকভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।

টেলিকম বিশ্লেষক আব্দুল হাকিম খান বলেন,

“সিটিসেলের এই উদ্যোগ সাহসী। তবে বাংলাদেশে টাওয়ার ও ব্যান্ডউইথ খরচের কারণে কম রেটে টিকে থাকা সহজ নয়। যদি তারা সরকারি সহযোগিতা বা নতুন বিনিয়োগ পায়, তবে এটি গ্রামীণফোনদের জন্যও চাপ তৈরি করবে।”

মেয়াদবিহীন ইন্টারনেট প্যাকেজ: নতুন ধারনা

সিটিসেল ঘোষণা দিয়েছে, এবার তারা “মেয়াদবিহীন ইন্টারনেট প্যাকেজ” চালু করবে। অর্থাৎ, ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট ডেটা কিনে যতদিনে খুশি ততদিনে ব্যবহার করতে পারবেন—কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকবে না।

এটি দেশের জন্য এক নতুন ধারণা, কারণ এখন পর্যন্ত সব অপারেটরই ৩ দিন, ৭ দিন বা ৩০ দিনের নির্দিষ্ট মেয়াদে ডেটা প্যাকেজ দেয়।

একজন তরুণ ব্যবহারকারী এ বিষয়ে বলেন,

“আমরা যারা কম ইন্টারনেট ব্যবহার করি, মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়াটা খুব বিরক্তিকর। মেয়াদবিহীন প্যাকেজ থাকলে সেটা সত্যিই দারুণ হবে।”

দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক বিস্তারের পরিকল্পনা

প্যাসিফিক টেলিকম জানিয়েছে, এবার তারা দেশব্যাপী টাওয়ার স্থাপন ও আপগ্রেড করছে যাতে গ্রাহকরা “নিরবিচ্ছিন্ন সেবা” পান। এর জন্য তাদের বিদেশি অংশীদার এবং স্থানীয় অবকাঠামো কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে।

কোম্পানিটি আরও জানিয়েছে, তারা সরকার অনুমোদিত ব্যান্ডউইথ ও ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগে পরীক্ষামূলক সেবা চালু করা হবে।

প্রযুক্তি পরিবর্তন: সিডিএমএ থেকে জিএসএম

সিটিসেলের অন্যতম বড় পরিবর্তন হচ্ছে তাদের প্রযুক্তিগত রূপান্তর। আগে তারা ব্যবহার করত CDMA (Code Division Multiple Access), যা আন্তর্জাতিকভাবে কম ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ মোবাইল নেটওয়ার্ক GSM বা LTE ভিত্তিক

GSM-এ ফিরে আসা মানে, সিটিসেলের সিম এখন যেকোনো সাধারণ স্মার্টফোনে কাজ করবে, আলাদা হ্যান্ডসেট লাগবে না।

গ্রাহকের প্রত্যাশা ও বাজারের বাস্তবতা

বাজারে বর্তমানে চারটি অপারেটরের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে। নতুন করে সিটিসেলের আগমন গ্রাহকদের জন্য ভালো খবর হলেও, সফল হতে হলে তাদেরকে—

  • নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক কাভারেজ,
  • সহজ রিচার্জ সুবিধা,
  • কার্যকর গ্রাহক সেবা,
  • এবং টেকসই মূল্যে মানসম্পন্ন ডেটা সরবরাহ—
    এই চারটি ক্ষেত্রে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করতে হবে।

টেলিকম বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রযুক্তি ও সাশ্রয়ী প্যাকেজ দিয়ে বাজারে প্রবেশ করা সহজ, কিন্তু গ্রাহক আস্থা পুনর্গঠনই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

সিটিসেলের নতুন অভিযাত্রা বাংলাদেশের টেলিকম খাতে এক সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে—যদি তারা প্রযুক্তি, সেবা এবং মূল্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।

এক সময় যে নামটি হারিয়ে গিয়েছিল, সেটি আবার আলোচনায়। এবার প্রশ্ন একটাই—
সিটিসেল কি ফিরে পাবে সেই হারানো আস্থা, নাকি ইতিহাসই আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *