অগ্নিনির্বাপণে ফায়ার সার্ভিসের সাহস আছে, কাঠামো নেই

নুরুল ইসলাম বাবুল

আমাদের ফায়ার সার্ভিসের সাহস আছে, কিন্তু কাঠামো নেই। প্রশিক্ষণ নেই, সরঞ্জাম নেই, আর নেই যুদ্ধের মতো পরিকল্পিত প্রস্তুতি।

“আগুনকে সময় দেওয়া মানে আগুনকে শক্তি দেওয়া।”
এই কথাটি China Fire & Rescue–এর নীতিমালায় যেমন বাস্তব সত্য, তেমনি বাংলাদেশের জন্য এটি এক কঠিন সতর্কবার্তা।

চীনে আগুন লাগার ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যেই ফায়ার ইঞ্জিন ডিসপ্যাচ হয়। আর ০৪ মিনিট ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশে সেই সময়সীমা প্রায় ১৫–৩০ মিনিট—ঢাকায় যানজট, সংকীর্ণ রাস্তা, পানি না থাকা, কিংবা সরঞ্জামের অভাব মিলিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সাহসী কর্মীরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক সময় আগুন “Fully Developed Stage”-এ পৌঁছে যায়। তখন তাদের হাতে যা থাকে, তা হলো অপর্যাপ্ত পানি, অতিরিক্ত তাপ, এবং হেরে যাওয়া যুদ্ধক্ষেত্র।

চীনের পেশাদারিত্ব বনাম আমাদের মনোবল

চীনের Fire & Rescue কাঠামোটি একধরনের সামরিক শৃঙ্খলাপ্রশিক্ষণ-কেন্দ্রিক পেশাদারিত্বে গড়া।
তাদের প্রতিটি ইউনিটে থাকে দুটি ডিটাচমেন্ট — এক দল স্ট্যান্ডবাই থাকে, আরেক দল অনুশীলনে। প্রতিদিনই মহড়া চলে; সময়ের এক সেকেন্ডও অপচয় নয়।
কারণ, তাদের নীতিতে বলা আছে—

“যে ফায়ার ফাইটার সময় হারায়, সে আগুনের কাছে হার মেনে নেয়।”

অন্যদিকে বাংলাদেশের Fire Service & Civil Defence (FSCD) সদস্যরা সেই একই আগুনের বিরুদ্ধে লড়ে চলেছেন নগণ্য প্রশিক্ষণ ও পুরোনো সরঞ্জাম নিয়ে। তাদের পেশাদারিত্বের বদলে আমরা দেখি অদম্য মনোবল—যেটি প্রশংসনীয়, কিন্তু তা কখনোই প্রযুক্তি, পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নয়।

বাংলাদেশে শহর পরিকল্পনায় অগ্নি-নিরাপত্তা কোনো উপাদানই নয়। ফায়ার হাইড্রান্ট নেই, জরুরি রাস্তা নেই, এমনকি কোথাও কোথাও ফায়ার স্টেশন থেকে বের হওয়ার রাস্তা পর্যন্ত অবরুদ্ধ থাকে অবৈধ পার্কিংয়ে। চীনে ফায়ার হাইড্রান্টের সামনে গাড়ি পার্ক করলে তাৎক্ষণিক জরিমানা হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে, সেই হাইড্রান্ট খুঁজে পাওয়া যায় না, আর থাকলেও তার চারপাশে দোকান, ময়লা বা পানির লাইন ভেঙে দেওয়া হয়।
এই দেশটিতে “আগুন লাগলে কল দাও” সংস্কৃতি আছে, কিন্তু “আগুন লাগার আগে প্রতিরোধ করো”—এই সংস্কৃতি নেই।

সময়ই এখানে শত্রু

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বিশ্লেষণে জানা যায়—

  • ০৭ মিনিট পর আগুন “Fully Developed Stage”-এ যায়,
  • ১০ মিনিটে শুরু হয় “Flashover” — আগুন এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিস যদি ১৫ মিনিট পরে পৌঁছায়, তবে তারা মূলত এমন এক আগুনের মুখোমুখি হন, যা কোনো মানুষের শক্তিতে দমনযোগ্য নয়। অতএব, প্রশ্নটি আগুন নিভানোর নয়; প্রশ্নটি সময় মতো পৌঁছানোর

যুদ্ধ নয়, প্রস্তুতি দরকার

আগুনের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে যুদ্ধ নয়—এটি একটি নির্ভুল সাড়া ব্যবস্থার (Response System) লড়াই।
চীন তা বুঝেছে, বাংলাদেশ এখনো তা শেখেনি।
আমাদের দেশে ফায়ার সার্ভিসকে এখনো “দুর্যোগে উদ্ধারকারী” হিসেবে দেখা হয়, দুর্যোগ প্রতিরোধকারী হিসেবে নয়।

এখন সময় এসেছে Fire Service & Civil Defence–কে একটি Specialized National Force হিসেবে গড়ে তোলার —
যেখানে থাকবে:

  • আঞ্চলিক ট্রেনিং একাডেমি ও রেসপন্স স্কুল,
  • প্রতিটি শহরে হাইড্রান্ট ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা,
  • উচ্চমানের ফায়ার ভেহিকল ও GIS-বেসড রাউটিং সিস্টেম,
  • এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বাংলাদেশের ফায়ার ফাইটাররা প্রতিদিন আগুনে প্রবেশ করেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে— তাদের সাহস আছে, কিন্তু আমাদের সমাজ তাদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করেনি।
চীন তাদের ফায়ার সার্ভিসকে দিয়েছে গতি, প্রযুক্তি, সময় ও মর্যাদা। আমরা দিয়েছি বিলম্ব, যানজট, আর শোকবার্তা।

যদি আজ আমরা “আগুন”কে কেবল বিপর্যয় হিসেবে দেখি, তবে আগামী প্রজন্ম “অব্যবস্থাপনা”কেই বিপর্যয় হিসেবে দেখবে।
আর তখন আমাদের ফায়ার সার্ভিস শুধু আগুনের সঙ্গে নয়, ইতিহাসের সঙ্গেও লড়বে।

লেখক : শিক্ষক, গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *