ডাঃ মআআ মুক্তাদীর
ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন—মোদি তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে। ট্রাম্পের নিজের ভাষায়, “তিনি (মোদি) আমাকে বলেছেন, রাশিয়া থেকে আর তেল কেনা হবে না। যদিও এটি তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়, তবে প্রক্রিয়াটি শিগগিরই শেষ হবে।”
এই বক্তব্যে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কিছুটা আলোড়ন উঠেছে। কিন্তু নয়াদিল্লি কোনো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বরং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বিবৃতি পড়লে দেখা যায়—ভারত বিষয়টিকে কূটনৈতিক ভারসাম্যের জায়গায় রাখছে।
আমাদের অগ্রাধিকার ভোক্তার স্বার্থ
জয়সওয়াল বলেছেন,
“ভারত তেল ও গ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমদানিকারক দেশ। অস্থির জ্বালানি পরিস্থিতিতে ভারতীয় ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা সবসময়ই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।”
এটি নতুন কিছু নয়। দিল্লি বরাবরই বলে এসেছে—তাদের জ্বালানি নীতি মূলত ভোক্তার নিরাপত্তা ও দামের স্থিতিশীলতা ঘিরে। তবে এই বক্তব্যের শেষাংশে যুক্ত হয়েছে এমন একটি লাইন, যা অনেক কিছু ইঙ্গিত করে।
তিনি বলেন,
“যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে, আমরা বহু বছর ধরে আমাদের জ্বালানি কেনার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করে আসছি। গত এক দশকে এতে ধারাবাহিক অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমান প্রশাসন ভারতের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা গভীর করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে।”
এই অংশই পুরো বিবৃতির কেন্দ্রবিন্দু। কারণ এটি একদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে আংশিক সামঞ্জস্যপূর্ণ, অন্যদিকে নয়াদিল্লির বহুমুখী জ্বালানি কৌশলের ইঙ্গিতবাহী।
জ্বালানি কূটনীতির পেছনের হিসাব
ভারত এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। প্রতি দিন দেশটি প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এই আমদানির বড় অংশ আসে রাশিয়া, সৌদি আরব ও ইরান থেকে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে রেকর্ড পরিমাণ সস্তা তেল কিনেছে। এর ফলে রাশিয়া ভারতের তেল আমদানির শীর্ষ সরবরাহকারীতে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এই অবস্থায় খুশি ছিল না, কিন্তু দিল্লি বলেছিল—“আমরা ভোক্তার স্বার্থ দেখব, ভূরাজনীতি নয়।”
এখন ট্রাম্পের বক্তব্যের পর যে নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, সেখানে নয়াদিল্লি একই নীতিকেই নতুন কৌশলে সাজাচ্ছে। একদিকে রাশিয়া থেকে সস্তা তেল কেনা বন্ধ না করার ইঙ্গিত, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বাড়ানোর আশ্বাস।
ওয়াশিংটনের আসল লক্ষ্য কী?
ট্রাম্প বা বাইডেন—দুজনেরই একটি অভিন্ন লক্ষ্য আছে: যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাসের রপ্তানি বাজার বাড়ানো। মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো গত এক দশকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) রপ্তানিতে বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান নিয়েছে।
ভারত সেই বাজারের সম্ভাব্য বড় ক্রেতা। ওয়াশিংটন তাই নয়াদিল্লিকে রাশিয়ার তেল নির্ভরতা থেকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রমুখী করতে চায়। ট্রাম্পের বক্তব্যের রাজনৈতিক দিক যতই আলোচিত হোক না কেন, এর অর্থনৈতিক দিকটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের কৌশল: দুই দিকেই ভারসাম্য
দিল্লির বর্তমান অবস্থানকে বলা যায় ‘জ্বালানি ভারসাম্যনীতি’। তারা জানে—রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন করা সম্ভব নয়। কারণ সেখানে শুধু তেল নয়, প্রতিরক্ষা ও পারমাণবিক প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতাও জড়িত।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রাখা ভারতের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের জন্য জরুরি। চীনকে ঘিরে যে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ জোট তৈরি হয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কৌশলগত অংশীদার। ফলে দিল্লি ওয়াশিংটনকে একদম উপেক্ষা করার অবস্থায় নেই।
ফলে ভারতের কৌশল এখন দ্বিমুখী—রাশিয়া থেকে সস্তা তেল কেনা অব্যাহত রাখা, এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার দরজা খোলা রাখা।
আগামী দিনের হিসাব
ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস, ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়গুলোও রয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল তেল বাণিজ্যের প্রশ্ন নয়, বরং ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার কাঠামো নিয়েও আলোচনা।
তবে এই সমঝোতার বিনিময়ে দিল্লি কোনো কূটনৈতিক ছাড় দিচ্ছে কি না, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। হয়তো সেটিই আগামী মাসগুলোতে পরিষ্কার হবে, যখন ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন কোনো চুক্তি বা সমঝোতা ফ্রেমওয়ার্ক প্রকাশ পাবে।
ট্রাম্পের বক্তব্য নির্বাচনী রাজনীতির অংশ হতে পারে, কিন্তু নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়া নিছক প্রতিক্রিয়া নয়। এটি এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত—যেখানে ভারতের জ্বালানি কূটনীতি ক্রমেই অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝের সূক্ষ্ম সীমারেখায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কিংবা উপসাগর—সব দিকেই এখন ভারতের হিসাব সতর্ক ও ঠান্ডা মাথার।
এ হিসাব কেবল তেলের নয়, কৌশলেরও।