শেরপুরের নলবাইদ ইউনিয়নে ঐতিহ্যবাহী জারি গানের আসরে হামলার ঘটনা আবারও তুলে ধরেছে—ধর্মের নামে কেমন করে একটি গোষ্ঠী দেশের শিকড়-সন্ধানী সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) রাতে নয়াপাড়া গ্রামে স্থানীয় তরুণদের আয়োজিত জারি গানের মঞ্চে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে একদল তৌহিদী জনতা। তবে এবার তারা গ্রামবাসীর কঠোর প্রতিরোধের মুখে পড়ে গণপিটুনির শিকার হয়।
গ্রামবাসীর সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে একই এলাকায় প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত জারি গানের আসরেও একই গোষ্ঠী “হারাম” ফতোয়া দিয়ে অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয়। স্থানীয় কিছু মাদ্রাসা শিক্ষক, ছাত্র ও মসজিদের ইমাম নিজেদের ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ে দাবি করেন—জারি গান ইসলামবিরোধী। কিন্তু শিল্পমনস্ক যুবকেরা সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই দ্বিতীয় দফায় আবারও আসরের আয়োজন করেন।
এবারও তৌহিদী জনতা একই কায়দায় হামলা চালিয়ে মঞ্চ ভাঙচুর করে। তারা অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে শিল্পীদের অপমান করে এবং গানের আসর বন্ধ করার হুমকি দেয়। কিন্তু আয়োজকেরা পিছু না হটে পাল্টা জবাব দেন, “এই গ্রামে আমাদের গান চলবে।” তখনই উপস্থিত শতাধিক শ্রোতা ও স্থানীয় মানুষ তৌহিদী জনতার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে যায়। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে হামলাকারীরা গণপিটুনির শিকার হয়। আহত সাতজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা বলছেন, এ ধরনের হামলা দেশের লোকসংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত। ধর্মের নাম ভাঙিয়ে মৌলবাদীরা সমাজে বিভাজন ও ভয় সৃষ্টি করতে চায়। অথচ জারি গান, মারফতি গান কিংবা পালাগান—এসবই বাংলার আত্মার প্রকাশ, যেখানে ভক্তি, মানবতা ও নৈতিকতার বার্তা আছে।
গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এরা আল্লাহর নামে বিশৃঙ্খলা করে। ধর্ম শেখায় না, ভয় দেখায়। আজ ওরা গণধোলাই খেয়ে শিখেছে—বাংলার মাটিতে সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ করা যাবে না।”
এই ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা থাকলেও পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত। তবে সচেতন মহল মনে করছে, স্থানীয় প্রশাসন ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উচিত গ্রামীণ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—যাতে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কেউ জনগণের বিনোদন, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চর্চায় বাধা দিতে না পারে।