মুরাদ উদ দৌলা মিঠু
মানুষ বড় হয় নিজের ভুলভ্রান্তি আর লড়াইয়ের গল্পে। কিন্তু আজকের এই পৃথিবীতে, “শান্তি”র গল্প বলার অধিকার যেন কেবল পশ্চিমাদের হাতে। তারা যুদ্ধ চালায়, আগুন জ্বালায়, তারপর ছাইয়ের ভেতর থেকে পুরস্কার বিলায়—নোবেল শান্তি পুরস্কারের নামে।
এই বছরের প্রাপক মারিয়া মাচাদো। পেশায় সাংবাদিক, চরিত্রে মার্কিন ভূরাজনীতির অনুবাদক। প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলি গণহত্যার প্রকাশ্য সমর্থক একজন মানুষ কীভাবে শান্তির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে—এই প্রশ্নই এখন পৃথিবীর প্রতিটি বিবেকবান মানুষের মনে জ্বলছে। নোবেল কমিটি আগেও বলেছিল, “পুরস্কার আগের কাজের ভিত্তিতে।” কিন্তু মারিয়া তো পুরস্কার পাওয়ার আগেই বহুবার বলেছেন, তিনি ইজরায়েলের সামরিক অভিযানকে ন্যায্য মনে করেন। তাহলে? তাহলে হয়ত শান্তি আর হত্যার পার্থক্যটাও আজ মার্কিন সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করছে।
লাইনাস পাউলিং, দু-দুবার নোবেলপ্রাপ্ত, যিনি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও বিশ্বশান্তির জন্য বিজ্ঞানীদের ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন—তিনি জানতেন, বিজ্ঞান ও মানবতার দায় এক। আর আজ? শান্তির পুরস্কার চলে যাচ্ছে তাদের হাতে, যারা গণহত্যাকে “প্রতিরক্ষা অভিযান” বলে চালিয়ে দিতে পারেন।
মারিয়ার নোবেল ঘোষণার দিন থেকেই ভেনেজুয়েলার রাস্তায় মানুষ বলছে—“এ পুরস্কার শান্তির নয়, এটি ট্রাম্প-নেতানিয়াহু জোটের নতুন পিআর।”
এ যেন পুরোনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। মনে পড়ে যায় হেনরি কিসিঞ্জারের কথা—ভিয়েতনামে লক্ষাধিক মানুষকে বোমায় উড়িয়ে দিয়েও “শান্তি” পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। আজও সেই ধারা বহমান। কিসিঞ্জার যেমন ওয়াশিংটনের যুদ্ধনীতিকে “শান্তির নকশা” বলে চালিয়েছিলেন, নেতানিয়াহুও আজ গাজাকে “সন্ত্রাস দমন” বলে রক্তে রাঙাচ্ছেন। আর নোবেল কমিটি সেই একই ছাঁচে নতুন মুখ বসিয়ে পুরস্কার দিচ্ছে—যেন পৃথিবীর চোখে ছাই দেওয়ার একটা প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি তৈরি করে ফেলেছে তারা।
আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যম যেভাবে ক্ষমতার প্রতি লেজুড়বৃত্তি করে, সেই একই রকম আনুগত্য আজ দেখা যাচ্ছে ইউরোপের তথাকথিত “শান্তি অভিভাবকদের” মধ্যেও। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ইঙ্গিতেই কারা “গণতন্ত্র রক্ষাকারী” আর কারা “হুমকি”—তার তালিকা তৈরি হয়। নোবেল কমিটি শুধু সেই তালিকাটা পড়ে শোনায়।
যে পৃথিবীতে মহাত্মা গান্ধী নোবেল পাননি, সেখানে কিসিঞ্জার পেয়েছিলেন—এই ব্যঙ্গই আজ বাস্তবতার রূপ নিয়েছে।
আজ মহিলারা, শিশুরা, হাসপাতাল, সংবাদকর্মী—কেউ নিরাপদ নয়। গাজায় প্রতি রাতে মানুষ মারা যাচ্ছে, আর সেই রাতেই অসলো থেকে ঘোষণা আসছে, “আমরা শান্তির পক্ষে।”
শান্তি আজ রক্তমাখা এক শব্দ, যা পশ্চিমা সাম্রাজ্যের প্রেস রিলিজে খুব ভালো মানায়।
তবু মানুষ ভোলে না। যেমন ভুলে যায়নি সু কি-র নীরবতা, ভুলে যাবে না মারিয়া মাচাদোর এই ভণ্ড মুখোশ। সময় সব চেয়ে বড় বিচারক।
পৃথিবী একদিন হয়তো নতুন শান্তির সংজ্ঞা খুঁজে পাবে—যেখানে ইজরায়েলি যুদ্ধবিমান নয়, কোনো কৃষক, কোনো শিক্ষক, কোনো অগ্নিনির্বাপক কর্মীর মুখে ‘মানবতার জয়’ উচ্চারিত হবে।