মরক্কো বদলে দিল বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র

 

চিলির সান্তিয়াগো শহরের ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে রোববার রাতে ঘটল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ফিফা অনূর্ধ্ব–২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে ২–০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতেছে মরক্কো। এই জয় শুধু একটি ট্রফি নয়—এটা পুরো আফ্রিকা ও আরব ফুটবলের গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

খেলা শুরুর মাত্র ১২ মিনিটের মাথায়ই এগিয়ে যায় মরক্কো। মাঝমাঠ থেকে পাওয়া ফ্রি–কিকে দারুণ এক কার্ভে গোল করেন ইয়াসির জাবিরি। গোলের পর থেকেই আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে মরক্কো দল। আর্জেন্টিনার পক্ষে কোনোভাবে ম্যাচে ফেরার সুযোগই দেয়নি তারা।

২৮ মিনিটে আরও একবার ঝলক দেখান জাবিরি। বাম দিক থেকে বক্সে ঢুকে নিম্নচাপের এক শটে গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে বল পাঠান তিনি। দুই গোলেই যেন বোঝা যায়—মরক্কো শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আসেনি, ইতিহাস গড়তে এসেছে।

ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই কিছুটা চাপের মধ্যে ছিল। বল দখলে এগিয়ে থাকলেও গোলমুখে তেমন কার্যকর আক্রমণ গড়তে পারেনি তারা। প্রথমার্ধের শেষ দিকে দুই–একটি সুযোগ পেলেও মরক্কোর রক্ষণভাগ ও গোলরক্ষক আলি বেনচেরিফে ছিলেন অটল প্রাচীরের মতো।

দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনার কোচ আক্রমণভাগে তিনটি পরিবর্তন আনেন, কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। মরক্কোর শৃঙ্খলিত রক্ষণভাগ আর সংগঠিত কাউন্টার–অ্যাটাক আর্জেন্টিনাকে পুরো ম্যাচ জুড়েই বিব্রত করে রাখে।

এই জয়ে মরক্কো হয়ে গেল প্রথম আফ্রিকান দেশ, যারা ফিফা অনূর্ধ্ব–২০ বিশ্বকাপ জিতল। এর আগে ঘানাই একমাত্র আফ্রিকান দেশ হিসেবে ২০০৯ সালে ফাইনালে উঠেছিল এবং শিরোপা জিতেছিল।

মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি ম্যাচ শেষে বলেন,

“আমাদের ছেলেরা জানত—এটাই তাদের জীবনের সুযোগ। তারা আজ শুধু নিজেদের জন্য নয়, সমগ্র আফ্রিকার জন্য লড়েছে।”

গ্রুপ পর্ব থেকেই মরক্কো ছিল দুর্দান্ত। স্পেনকে ২–০ ও ব্রাজিলকে ২–১ গোলে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয়ে নকআউটে ওঠে। কোয়ার্টার ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রকে ৩–১ এবং সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ১–০ গোলে হারিয়ে জায়গা করে নেয় ফাইনালে।

পুরো টুর্নামেন্টে মরক্কো মাত্র দুই গোল হজম করেছে। ৬ ম্যাচে জয় ৫টি, ড্র ১টি—এমন ধারাবাহিক পারফরম্যান্সেই তারা আজ বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেল।

জয়ের পর স্টেডিয়ামজুড়ে গর্জে ওঠে ‘আল–আটলাস লায়ন্স’-এর সমর্থকরা। খেলোয়াড়রা পতাকা হাতে মাঠ ঘুরে উদ্‌যাপন করেন। রাবাত, কাসাব্লাঙ্কা, মারাকেশ—সব শহরেই রাতভর উৎসব চলে। রাজা মোহাম্মদ ষষ্ঠ টেলিফোনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন দলের সবাইকে।

এই জয়ে ফুটবলবিশ্বে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে মরক্কো—দক্ষিণ আমেরিকা বা ইউরোপই এখন আর ফুটবলের একমাত্র রাজত্ব নয়। ২০২২ বিশ্বকাপে সিনিয়র দল যে উত্থান দেখিয়েছিল, এই অনূর্ধ্ব–২০ দল সেটাকে আরও দৃঢ় করল।

মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, এই দলকেই ভবিষ্যতের জাতীয় দলে পরিণত করতে তারা বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেবে।

বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলারদের জন্যও মরক্কোর এই সাফল্য অনুপ্রেরণার। সীমিত অবকাঠামো ও সামর্থ্যের মধ্যেও দলগত পরিকল্পনা, মানসিক প্রস্তুতি আর সুসংগঠিত একাডেমি কাঠামোর জোরে কিভাবে বিশ্বজয় করা যায়—মরক্কো তার দৃষ্টান্ত রেখেছে।

মরক্কোর এই জয় প্রমাণ করল—ফুটবলে ঐতিহ্য নয়, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রস্তুতি ও দলগত বিশ্বাস। আর্জেন্টিনা হয়তো ইতিহাসের দল, কিন্তু আজ ইতিহাস লিখল মরক্কো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *