বাড়ছে খরার প্রকোপ: ভূগর্ভস্থ পানি সংকটে কৃষি বিপর্যয়ের আশঙ্কা

 

১৯৮০’র দশক—বাংলাদেশের ইতিহাসে খরার এক কালো অধ্যায়। সে সময় দেশের উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমি দীর্ঘমেয়াদি খরায় আক্রান্ত হয়, যা কৃষি ও জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ফসলহানির পাশাপাশি মানুষের জীবন-জীবিকায় দেখা দেয় চরম দুরাবস্থা। সেই সংকট মোকাবিলায় গড়ে ওঠে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প, যা পরবর্তীতে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় রূপ নেয়।

তবে ইতিহাস বলছে, খরার প্রভাব শুধুমাত্র বরেন্দ্র অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৮০-এর দশকে দেশের ১৬টি জেলা অতি খরা এবং আরও ১৫টি জেলা অল্প খরা প্রবণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। অর্থাৎ, বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল তখনই খরার ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল।

খরার সময় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনকে একসময় মনে করা হয়েছিল খরা মোকাবিলার আশীর্বাদ। বিএমডিএ ও অন্যান্য সংস্থা গভীর নলকূপ স্থাপন করে কৃষিতে সেচের নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে এই উদ্যোগ দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং খাদ্য ঘাটতি কমাতে বড় ভূমিকা রাখে।

কিন্তু সময়ের সাথে দেখা দেয় উল্টো প্রভাব। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ৩ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত নিচে নামছে—বিশেষত রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট এলাকায়।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, গত তিন দশকে এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অন্তত ২০–২৫ মিটার নিচে নেমে গেছে। ফলস্বরূপ, অনেক নলকূপে এখন আর পানি ওঠে না, শুকিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও খাল-বিল।

বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের ধরণ গত দুই দশকে ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। বর্ষাকালে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এবং দীর্ঘ সময়ের খরা—এই বৈপরীত্যের মধ্যে পড়ে কৃষকরা দিশেহারা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ৪০ বছরে দেশের গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১০–১২ শতাংশ কমেছে, এবং শুষ্ক মৌসুমের দৈর্ঘ্য বেড়েছে প্রায় ২৫–৩০ দিন

একসময় শুধুমাত্র বরেন্দ্র অঞ্চলকে খরাপ্রবণ হিসেবে ধরা হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে ৩০টির মতো জেলা মধ্যমমানের খরায় ভুগছে, যার মধ্যে উত্তর-পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

খরার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন। আমন ও রবি মৌসুমে পানি সংকটে অনেক কৃষক চাষাবাদ ছেড়ে দিচ্ছেন। মাটির আর্দ্রতা হ্রাস পাওয়ায় ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে, আর ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা বাড়ছে দক্ষিণাঞ্চলে।

একই সঙ্গে, খরা প্রাণিকূলেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। বিল, হাওর, জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে।

পরিবেশবিদদের মতে, যদি বর্তমান হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব চলতে থাকে, তবে আগামী ২০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলা অতি খরা প্রবণ হয়ে উঠবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০৫০ সালের মধ্যে গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বাংলাদেশের শুষ্ক অঞ্চল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা না নিলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাধার পুনর্নির্মাণ, সেচে ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প খোঁজা এবং খরা সহনশীল ফসল চাষের দিকেই হতে হবে অগ্রাধিকার।

পরিবেশবিজ্ঞানী ড. শামসুল হক বলেন,

“আমরা একসময় ভেবেছিলাম নলকূপই আমাদের মুক্তি দেবে। এখন সময় এসেছে—বৃষ্টি, নদী আর প্রাকৃতিক জলাধারের ওপর নির্ভরশীলতায় ফিরে যাওয়ার।”

বাংলাদেশের খরার ইতিহাস এখন নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। একসময় যে সমস্যা ছিল উত্তরাঞ্চলকেন্দ্রিক, আজ তা জাতীয় সংকটে পরিণত হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ওপর অন্ধ নির্ভরতা আর জলবায়ুর অস্থিরতা—এই দুইয়ের ফাঁদে পড়েছে বাংলাদেশের কৃষি ও মানুষ। এখনই উদ্যোগ না নিলে, আগামীর মানচিত্রে “সবুজ বাংলাদেশ” হয়তো “শুষ্ক বাংলাদেশ”-এ পরিণত হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *