গাড়ির বয়সসীমা ৫ থেকে ১০ বছর করতে চায় ইম্পোর্টাররা
লাভের ফাঁদে পুরোনো গাড়ির খেলা

 

ঢাকার রাস্তায় চলাচল করা গাড়িগুলোর দিকে তাকালে চারটি নাম প্রায়ই চোখে পড়ে—টয়োটা এলিয়ন, প্রিমিও, এক্সিও আর ফিল্ডার।এই চার গাড়িই বছরের পর বছর বাংলাদেশের রিকন্ডিশন গাড়ি বাজারের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত মডেল।
কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। জাপানে টয়োটা এলিয়ন ও প্রিমিওর উৎপাদন বন্ধ করেছে ২০২১ সালেই, আর এক্সিও ও ফিল্ডারের উৎপাদন শেষ হচ্ছে ২০২৫ সালে। ফলে ২০২৬ সালের পর এই চার গাড়ির নতুন ইউনিট আর দেশে আমদানি করা যাবে না।

এই বাস্তবতায় হঠাৎ করেই দেশের গাড়ি আমদানিকারকরা এখন গাড়ির বয়সসীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার দাবিতে সরব। তাদের যুক্তি—এতে নাকি সাধারণ ক্রেতারা কম দামে ভালো মানের গাড়ি পাবেন। কিন্তু অনুসন্ধান বলছে, গল্পটা এত সরল নয়।

বড় লাভের গাড়ি হারানোর ভয়

রিকন্ডিশন গাড়ি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ইম্পোর্টার জানালেন, এলিয়ন ও প্রিমিও তাদের সবচেয়ে লাভজনক গাড়ি। জাপান থেকে একটি এলিয়ন আসে ২০–২২ লাখ টাকায়, দেশে বিক্রি হয় ৪০ লাখে। প্রিমিও বিক্রি হয় প্রায় ৪৫ লাখে। একটি গাড়িতেই ১০–১২ লাখ টাকা পর্যন্ত নিট মুনাফা থাকে।

এখন উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় এই লাভের উৎস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই ইম্পোর্টারদের লক্ষ্য—বয়সসীমা বাড়িয়ে পুরোনো গাড়িগুলোকে আরও কয়েক বছর ধরে বাজারে চালিয়ে দেওয়া।

ভোক্তার আগ্রহ কম, ব্যবসায়ীর চাপ বেশি

গাড়ি ক্রেতাদের মধ্যে কিন্তু এই বিষয়ে তেমন সাড়া নেই।
মালিবাগের বাসিন্দা ফাহিমুল আলম বললেন,

“আমরা পুরোনো গাড়ি কিনতে চাই না। পাঁচ–ছয় বছরের বেশি পুরোনো গাড়িতে ঝামেলা বেশি, খরচও বাড়ে।”

অন্যদিকে ইম্পোর্টাররা প্রচার চালাচ্ছেন—বয়সসীমা বাড়লে ক্রেতারা কম দামে ভালো গাড়ি পাবেন। কিন্তু ভোক্তা সংগঠনগুলো বলছে, এটা ভোক্তাবান্ধব নয়, ব্যবসায়ীবান্ধব উদ্যোগ।

পরিবেশ ও নিরাপত্তার হুমকি

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ১০ বছরের পুরোনো গাড়ি দেশে ঢুকলে বায়ুদূষণ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে।
যন্ত্র প্রকৌশলী একরামুল হুদা বলেন,

“পুরোনো গাড়ির ইঞ্জিন ও এক্সহস্ট সিস্টেম ক্ষয়প্রাপ্ত থাকে। এতে জ্বালানি খরচ ও কার্বন নিঃসরণ অনেক বেড়ে যায়।”

বাংলাদেশে যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণের অন্যতম বড় উৎস। এ অবস্থায় পুরোনো গাড়ির আমদানি বাড়লে পরিবেশগত ক্ষতি ভয়াবহ হতে পারে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমাধান হতে পারে ট্যাক্স কাঠামো সংস্কারে

বর্তমানে ১৫০০ সিসির ওপরে গাড়িতে সরকার অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে। ফলে অনেকেই ১৮০০ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতার গাড়ি কিনতে চান না। কিন্তু জাপানে এখন প্রায় সব নতুন গাড়িই ১৮০০ সিসি বা তার বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মত, ১৫০০ থেকে ১৮০০ সিসির মধ্যে নতুন ট্যাক্স ব্রাকেট তৈরি করা গেলে বাজার ভারসাম্যপূর্ণ হবে। তাহলে ক্রেতারা আধুনিক হাইব্রিড গাড়ির দিকে ঝুঁকবেন, ইম্পোর্টাররাও বিকল্প লাভের সুযোগ পাবেন।

নতুন গাড়ির দিকে মনোযোগ সময়ের দাবি

২০২৩ সালে টোয়োটা প্রিয়াসের নতুন নকশা বাজারে এসেছে। আগের তুলনায় অনেক আকর্ষণীয়, আধুনিক ও জ্বালানিসাশ্রয়ী। তবে বাংলাদেশের নিচু রাস্তা ও ট্যাক্স কাঠামো এর প্রসারে বাধা।

তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুরোনো মডেল ধরে রাখার চেয়ে নতুন প্রযুক্তির গাড়ির দিকে যাওয়াই ভবিষ্যতের পথ। তাতে পরিবেশ রক্ষা হবে, ক্রেতার নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।

গাড়ির বয়সসীমা ১০ বছর করার দাবি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে বড় আর্থিক স্বার্থ।
পুরোনো গাড়ির ব্যবসায় অস্বাভাবিক মুনাফা করতে চায় ইম্পোর্টাররা। কিন্তু তাতে ক্ষতি হবে ভোক্তা, পরিবেশ ও দেশের অর্থনীতিরই।

এখন সময় এসেছে এমন নীতির, যেখানে গাড়ি আমদানির মূল লক্ষ্য হবে গুণগত মান, নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন— লাভ নয়, দায়িত্বই হবে প্রধান চালিকা শক্তি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *