ঢাকা, ২ অক্টোবর — নয় দিনের পূজো-আর্চনা, উৎসব ও আনন্দোল্লাস শেষে আজ শেষ হলো দুর্গোৎসব। মহানবমীর পর আজ বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানালেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দেবীর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি হলো বছরের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের।
মহিষাসুর বধের মাহাত্ম্য
শাস্ত্র মতে, এই দিনে দেবী দুর্গা অসুররাজ মহিষাসুরকে বধ করেন। অশুভ শক্তির পতন ও শুভ শক্তির জয়ধ্বনি ঘোষণা করেন তিনি। পুরোহিতদের মতে, বিজয়া দশমীর বার্তাই হলো—অসুর শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত ন্যায়, সত্য ও ধর্মের জয় হবেই।
ঢাকার রমনা কালীমন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিমল চক্রবর্তী বলেন, “মহিষাসুর বধ শুধু পৌরাণিক কাহিনি নয়, এটি মানুষের মনে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন বার্তা। জীবনে যত অশুভই আসুক, দেবীশক্তি তার প্রতিরোধ করবে।”
বিদায়ের বেদনা
তবে বিজয়া শুধু আনন্দের দিন নয়; বেদনারও দিন। লোকাচার মতে, দেবী দুর্গা বা উমা (পার্বতী) বাবার বাড়ি—হিমালয় ও মেনকার গৃহে মাত্র পাঁচ দিনের জন্য আসেন। সেই সময় শেষ হলে দশমীতে তাঁকে আবার কৈলাসে ফিরে যেতে হয়।
এই বিদায়ের মুহূর্তে ভক্তদের মনে শূন্যতা নেমে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল পূজামণ্ডপে উপস্থিত ভক্ত লিপি দাশ জানান, “বছরের পর বছর এই দিনটি কাঁদায়। মা এলেন, সব পূর্ণ করলেন, আবার চলে গেলেন। তবু আশার কথা—আসছে বছর আবার আসবেন।”
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
ঐতিহাসিকরা জানান, প্রাচীনকাল থেকেই দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতির উৎসব হিসেবেও পালিত হয়ে আসছে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান পর্ব পর্যন্ত দুর্গোৎসবকে ঘিরে গ্রামবাংলায় মেলা বসা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি জোরদার করার নজির পাওয়া যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার পাল বলেন, “দুর্গাপূজা কেবল দেবী বন্দনা নয়; এটি বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতিরও অংশ। বিজয়া দশমীতে ভক্তরা যেমন ভক্তির অশ্রু ঝরান, তেমনি সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান।”
ভ্রাতৃত্বের প্রতীক বিজয়া
আজ সারা দেশে পূজামণ্ডপে বিসর্জন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকায় বুড়িগঙ্গা, নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা ও চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানো হয়। ভক্তরা দেবীর কাছে প্রণাম করে পরস্পরের সঙ্গে “শুভ বিজয়া” বিনিময় করেন।
প্রতীক্ষার পালা শুরু
বিদায়ের বেদনা থাকলেও এর পরই শুরু হয় নতুন প্রতীক্ষা। পূজার সমাপ্তি মানে আবার এক বছরের আশাবাদ—দেবী আসবেন, নতুন করে অশুভ শক্তিকে বিনাশ করবেন, পৃথিবীতে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন। তাই ভক্তদের হৃদয়ে উচ্চারিত হয় একটাই আশাবাণী:
“আসছে বছর—আবার হবে।