চীনের নৌবাহিনীর ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। ‘ফুজিয়ান’—দেশটির তৃতীয় ও সবচেয়ে উন্নত বিমানবাহী জাহাজ—এখন আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা নৌবাহিনীর (PLAN) অংশ। হাইনান দ্বীপের সানয়া বন্দরে ৫ নভেম্বর আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং নিজ হাতে এই জাহাজকে ‘কমিশন’ করেন। এই ঘোষণা শুধু একটি জাহাজের উদ্বোধন নয়, বরং চীনের সমুদ্রপথে আধিপত্য বিস্তারের এক স্পষ্ট বার্তা।
সমুদ্রের দানব ‘ফুজিয়ান’
ফুজিয়ান নামটি এসেছে চীনের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের এক প্রদেশ থেকে, যেখানে দেশটির সবচেয়ে বড় নৌঘাঁটিগুলোর একটি অবস্থিত। জাহাজটি তৈরি হয়েছে সাংহাইয়ের জিয়াংনান শিপইয়ার্ডে।
এটি “টাইপ ০০৩” শ্রেণির প্রথম ইউনিট—পুরোপুরি চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত। আগের দুইটি জাহাজ, লিয়াওনিং ও শানডং, ছিল যথাক্রমে সোভিয়েত ও রাশিয়ান প্রযুক্তি নির্ভর।
ফুজিয়ানের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১৬ মিটার এবং ওজন ৮০ হাজার টনেরও বেশি। এর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো উন্নত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপাল্ট সিস্টেম (EMALS)—যা এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের Gerald R. Ford শ্রেণির জাহাজেই দেখা গেছে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে ভারী যুদ্ধবিমানগুলো কম জ্বালানি খরচে দ্রুত উড্ডয়ন করতে পারে।
এক নতুন কৌশলগত ধাপ
চীনের নৌবাহিনীর কাছে এই জাহাজের তাৎপর্য অনেক। বিশ্লেষকরা বলছেন, ফুজিয়ানের মাধ্যমে বেইজিং তার নৌবাহিনীকে ‘সবুজ জলের’ বাহিনী থেকে ‘নীল জলের’—অর্থাৎ বিশ্ব সমুদ্রজুড়ে কার্যক্ষম বাহিনীতে—পরিণত করতে চাইছে।
দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ফিলিপাইনের উপস্থিতি বাড়তে থাকায় চীনও নিজস্ব প্রভাববলয় রক্ষায় নৌক্ষমতা বাড়াতে সচেষ্ট। ফুজিয়ান সেই লক্ষ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র Royal United Services Institute (RUSI)-এর বিশ্লেষক জেমস চার বলেন, “ফুজিয়ান চীনের জন্য কেবল একটি যুদ্ধজাহাজ নয়, বরং সামুদ্রিক রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতীক।”
আগামী দিনের প্রস্তুতি
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ফুজিয়ান এখন কার্যকর, তবু এটি এখনও পূর্ণ যুদ্ধ প্রস্তুত অবস্থায় পৌঁছায়নি। নৌবাহিনীর পাইলটদের ক্যাটাপাল্ট সিস্টেমে অভ্যস্ত হতে সময় লাগবে। পাশাপাশি, ফ্লাইট অপারেশন, জ্বালানি সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো অনেক বিষয়েই প্রশিক্ষণ চলছে।
তবে চীন ইতিমধ্যে প্রশিক্ষিত এয়ার উইং তৈরি শুরু করেছে, যা J-15 এবং ভবিষ্যতে J-35 যুদ্ধবিমানের বহর ব্যবহার করবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ফুজিয়ান পুরোপুরি প্রস্তুত হবে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ “ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ” গঠন করবে—যেখানে থাকবে ডেস্ট্রয়ার, সাবমেরিন ও সরবরাহ জাহাজের সহায়তা।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমুদ্র
চীনের এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমুদ্রপথে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি নিউক্লিয়ার চালিত বিমানবাহী জাহাজ রয়েছে, যেখানে চীনের তিনটি—এবং সেগুলো ডিজেলচালিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটিগুলো এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে বিস্তৃত, আর চীন ধীরে ধীরে তার ঘাঁটি বাড়াচ্ছে—শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা থেকে জিবুতি পর্যন্ত।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফুজিয়ান সেই ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
নতুন দিগন্ত, পুরনো প্রশ্ন
প্রশ্ন হলো—চীন কি সত্যিই একটি ‘বিশ্বমানের নৌবাহিনী’ হতে পারবে?
বহু সামরিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রযুক্তি ও সম্পদ থাকলেও অভিজ্ঞতার অভাব চীনের বড় বাধা। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরাক, আফগানিস্তান পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে বাস্তব যুদ্ধ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। চীনের সেই সুযোগ হয়নি।
তবু ফুজিয়ান যেন একটি বার্তা ছুড়ে দিয়েছে—চীন এখন শুধু তার সীমান্ত নয়, সমুদ্রের সীমারেখাও পুনর্নির্ধারণ করতে চায়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস-এ এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, “ফুজিয়ান শুধু একটি যুদ্ধজাহাজ নয়; এটি এক জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন।”
এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রযুক্তিগত সাফল্য, এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার আগুন একসাথে জ্বলছে।
ফুজিয়ান তাই একদিকে সমুদ্রের শক্তি, অন্যদিকে চীনের ভবিষ্যৎ রাজনীতির প্রতীক।
এখন প্রশ্ন শুধু একটাই—এই শক্তি চীনের জন্য নিরাপত্তা বয়ে আনবে, নাকি নতুন অনিশ্চয়তার দ্বার খুলে দেবে?