“আমরা চাই না, আমাদের সন্তানেরা ভবিষ্যতে শুধু ছবিতে দেখুক সবুজ গাইবান্ধা।”— কথাগুলো বলছিলেন ২৩ বছর বয়সী রিফাত হাসান। গাইবান্ধার ছোট্ট শহর ঘোষণাপুরের এই যুবকের নেতৃত্বে গড়া ‘সবুজ যুব জোট’ গত সপ্তাহে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী ‘Eco Leaders 4th Batch Training & Networking Event’-এ বিজয়ী হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় তাদের পরিকল্পনা—নদীভাঙন কবলিত চরাঞ্চলে ‘ফ্লোটিং বাগান’ ও ‘স্কুল-অন-বোট’—প্রশংসা কুড়িয়েছে বিচারক মহলে।
৮-১০ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকার মিরপুর-ডোহারে অবস্থিত ‘The Earth’-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এই প্রশিক্ষণে দেশের পাঁচটি যুব দল অংশ নেয়। গাইবান্ধার ‘সবুজ যুব জোট’ ও ‘বর্ণ বিজ্ঞান ক্লাব’, সিলেটের ‘ইকো রুফ ক্রাফটার্স’, বান্দরবানের ‘Banana Bloom’ এবং ঢাকার ‘Eraser’—এই দলগুলোর ৪৫ জন তরুণ-তরুণী হাতে-কলমে শিখেছেন কীভাবে স্থানীয় সমস্যাকে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রেক্ষাপটে সমাধান করা যায়, কীভাবে ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর (Just Transition) নিশ্চিত করা যায় এবং ক্যাম্পেইনের ডিজাইন থেকে শুরু করে বাজেট তৈরি পর্যন্ত সবকিছু।
প্রশিক্ষণের শেষ দিনে ‘আইডিয়া প্রেজেন্টেশন সেশনে’ মোট ১২টি খসড়া প্রকল্প- উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে গাইবান্ধার ‘সবুজ যুব জোট’ তাদের ‘চরে সবুজ বিদ্যালয়’ প্রকল্পে দেখায়, কীভাবে পলি জমে ওঠা নতুন চরে স্থায়ী স্কুলঘর নির্মাণের আগেই নৌকায় পাঠদান, সোলার-চালিত ইন্টারনেট ও বীজতলা তৈরি করে স্থানীয় শিশুদের জলবায়ু অভিযোজনে প্রস্তুত করা যায়। অন্যদিকে সিলেটের ‘ইকো রুফ ক্রাফটার্স’ দেখায়, শহরের পুরনো বাড়ির ছাদে কৃষ্ণচূড়া-কাঠগোলাপের চারা রোপণ করে কীভাবে তাপদ্বীপ প্রভাব কমানো যায় এবং একই সঙ্গে বর্জ্য-কম্পোস্টিং করে বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করা যায়। বিচারকপ্যানেল—যেখানে ছিলেন ব্রিটিশ হাই কমিশনের ক্লাইমেট অ্যান্ড এনার্জি অ্যাডভাইজার হেলেন রিচার্ডসন, ‘The Earth’-এর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত—বলেন, “এই দুই প্রকল্পই স্থানীয় প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়নযোগ্য এবং পুনরুৎপাদনযোগ্য।”
প্রশিক্ষণের প্রতিটি সেশনই ছিল কর্মশালা-ভিত্তিক। ‘ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর’ সেশনে অংশগ্রহণকারীরা কার্বন-নিঃসরণ কমানোর দায় কীভাবে শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর বর্তায়, সেটি খেলার মাধ্যমে বুঝেছেন। ‘অ্যাডভোকেসি ম্যাপিং’-এ তারা নিজ নিজ জেলার সংসদীয় আসন চিহ্নিত করে দেখেছেন কোন এমপি পরিবেশবান্ধব কমিটিতে আছেন। ‘ক্যাম্পেইন বাজেট’ সেশনে ১০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা—তিনটি স্তরের বাজেটে কীভাবে ফেইসবুক-ইভেন্ট, পোস্টার প্রিন্ট, মাইক ভাড়া ও স্বেচ্ছাসেবী-খাবার বাবদ খরচ বণ্টন করা যায়, সেটি শিখেছেন হিসাব-কষে।
ব্রিটিশ হাই কমিশন, ঢাকার ডেপুটি হাই কমিশনার ম্যাট বক্স বলেন, “যুক্তরাজ্য ২০২১-২৬ মেয়াদে বাংলাদেশে জলবায়ু অভিযোপণে ২৯০ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ রেখেছে। তার একটি অংশ এই Eco Leaders Project-এ, কারণ আমরা বিশ্বাস করি, পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে তরুণরাই।” প্রকল্পটি ২০২২ সালে শুরু হয়ে ইতোমধ্যে ১৮০ জন তরুণকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে; চতুর্থ ব্যাচের মাধ্যমে সংখ্যাটি দাঁড়াল ২২৫-এ। আগামী বছরের মার্চে ‘Eco Leaders Summit’-এ পূর্ববর্তী চার ব্যাচের সেরা ১০টি প্রকল্প পুনঃমূল্যায়নের সুযোগ পাবে; সেখান থেকে বিজয়ী তিনটি দল পাবে ৩-৫ লাখ টাকা করে বাস্তবায়ন বাজেট।
প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে যাওয়ার আগের রাতে ‘ইকো রুফ ক্রাফটার্স’-এর সদস্য তানজিনা আফরিন বলেন, “আমরা ভাবতাম, ছাদ-বাগান শুধু সৌন্দর্য বাড়ায়। এখন বুঝেছি, এটি একটি কার্বন-সিংকও বটে!” একই সঙ্গে গাইবান্ধার রিফাত জানান, তাদের ‘চরে সবুজ বিদ্যালয়’ প্রকল্পটি ইতোমধ্যে স্থানীয় ইউএনও’র দপ্তর থেকে ১০ কাঠা জমির অনাপত্তিপত্র পেয়েছে।
তিন দিনের আয়োজন শেষ হলেও যাত্রাটা আসলে শুরু হলো এখান থেকেই। কারণ, যে তরুণরা রাজধানীতে এসে শিখে গেলেন কীভাবে নিজেদের গ্রাম-শহরের সমস্যাকে জলবায়ু সমাধানের অংশ করা যায়, তারাই তো আগামী দিনের ‘ইকো-লিডার’।