ফুটবলে আসছে কি পেনাল্টির নতুন যুগ?

 

গোলপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে আছেন গোলরক্ষক—দৃষ্টি স্থির, শ্বাস থেমে গেছে যেন। সামনের ১২ গজ দূরে দাঁড়ানো স্ট্রাইকারের কপাল ঘামে চকচক করছে। বাঁশি বাজল, শট নেওয়া হলো। বল বাতাসে উড়ে গেল… পোস্টে লেগে ফিরে এল মাঠে—আরেকজন দৌড়ে এসে রিবাউন্ডে জালে জড়াল বল! দর্শক গর্জে উঠল, গোল!

এমন দৃশ্য আমরা অসংখ্যবার দেখেছি, আর তাতেই ফুটবলের উত্তেজনা দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু সেই দৃশ্য হয়তো শিগগিরই ইতিহাস হয়ে যেতে পারে।

কারণ, বিশ্ব ফুটবলের নিয়মে বড় একটি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফিফা রেফারি কমিটির প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা সম্প্রতি এমন এক প্রস্তাব দিয়েছেন যা পেনাল্টির ধারণাকেই বদলে দিতে পারে—এখন থেকে পেনাল্টিতে রিবাউন্ড থেকে আর গোল করা যাবে না।

পিয়েরলুইজি কলিনা—ফুটবল বিশ্বের এক কিংবদন্তি নাম। মাথা ভরা টাক, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, মাঠে নির্ভুল সিদ্ধান্তের প্রতীক। এবার তিনি উঠে এসেছেন আরেকটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।

কলিনার মতে, পেনাল্টি এমনিতেই আক্রমণকারী দলের জন্য একটি বড় সুবিধা। গোলরক্ষক একাই লড়াই করে, আর শট নেওয়া খেলোয়াড়ের কাছে পুরো সুযোগ। এরপর যদি বল ফিরে আসে আর আরেকটি শটের সুযোগ মেলে—তা হলে তা ন্যায্য প্রতিযোগিতা নয়।

তার প্রস্তাব, “পেনাল্টি মানে একবারের সুযোগ। বল গোললাইনে ঢুকলে গোল, না হলে খেলা আবার শুরু হবে। রিবাউন্ড থেকে দ্বিতীয় সুযোগ নয়।”

এই মতামত এখন আলোচনায় আছে ফিফা ও ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডে (IFAB)। সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি, কিন্তু ভাবনাটা ইতিমধ্যে আলোচনায় ঝড় তুলেছে।

ভাবুন, ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল। জিদান পোস্টে বল মেরেছিলেন, ফিরে এলো, লাইন পেরোল—গোল! বা ২০১২-এর চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ড্রগবার বাঁচা-মরার লড়াইয়ে রিবাউন্ডে গোল করে চেলসিকে দিলেন শিরোপা।

এইসব মুহূর্তে ফুটবল তার নাটকীয়তা পেয়েছে। রিবাউন্ড মানে দ্বিতীয় জীবন, হারতে বসা দলের জন্য শেষ সুযোগ। দর্শক তখন শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করে—“বলটা ফেরত আসবে কি?”

যদি কলিনার প্রস্তাব কার্যকর হয়, এমন মুহূর্ত আর থাকবে না। একবারের শটে সব নির্ধারিত হবে—সাফল্য বা ব্যর্থতা, দুটিই এক মুহূর্তে চূড়ান্ত।

কলিনার দৃষ্টিতে বিষয়টা সরল—ফুটবলে ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনা দরকার। গোলরক্ষক যদি বল ঠেকায়, তাহলে তার পুরস্কার হওয়া উচিত বল পুনরায় খেলায় না ফেরানো।

এছাড়া রেফারিরাও অনেক সময় রিবাউন্ড-পরিস্থিতিতে বিভ্রান্ত হন। কেউ আগে ঢুকেছে কি না, ফাউল হয়েছে কি না—এসব নির্ধারণ কঠিন হয়। নিয়ম বদলালে এই ঝামেলাও কমবে।

সমালোচকরা বলছেন, ফুটবল শুধু ফল নয়—এটা আবেগ, নাটক, অনিশ্চয়তা। রিবাউন্ড সেই অনিশ্চয়তারই অংশ। পেনাল্টি মিসের পর বল ফিরে এলে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, সেটা একধরনের “রিয়েল-টাইম গল্প”।

ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক ডেভিড জেমস বলেছেন, “রিবাউন্ড না থাকলে ফুটবলের এক টুকরো নাটক মরে যাবে। দর্শকের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত পূর্বানুমানযোগ্য হয়ে যাবে।”

অন্যদিকে অনেক রক্ষণভাগের কোচ এই প্রস্তাবে স্বস্তি পাচ্ছেন। তাঁদের মতে, পেনাল্টি একবারই হওয়া উচিত—কারণ গোলরক্ষকের কাজ এক মুহূর্তে শেষ হওয়া উচিত, বারবার নয়।

যদি এই নিয়ম সত্যিই চালু হয়, পেনাল্টি নেওয়া খেলোয়াড়দের জন্য এটি মানসিক পরীক্ষার নতুন অধ্যায় হবে। এখনকার মতো “মিস হলে রিবাউন্ডে কেউ না কেউ ঠিক গোল করবে” এই ভরসা থাকবে না।

তারা হয়তো আরও মনোযোগী হবে শটের আগে। গোলরক্ষকও বুঝবে, যদি বল ঠেকাতে পারে, তার দল সঙ্গে সঙ্গে খেলার নিয়ন্ত্রণ পাবে।

এমন পরিবর্তনে ম্যাচের গতিপ্রকৃতি বদলাবে নিশ্চিতভাবেই। পেনাল্টি হয়তো তখন আর কেবল শাস্তি নয়—একটি সংক্ষিপ্ত দ্বৈরথ, যা এক নিশ্বাসে শেষ হবে।

এখনও নিয়ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়নি। IFAB-এর পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় উঠবে। অনেক দেশ চাইবে আগে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রায়াল চালাতে।

যদি কার্যকর হয়, তাহলে পরবর্তী বিশ্বকাপ বা ইউরোপীয় লিগগুলোয় আমরা নতুন দৃশ্য দেখব—এক শটে সব শেষ। কোনো বল ফেরত, কোনো দ্বিতীয় শট নয়।

ফুটবল সর্বদা পরিবর্তনশীল খেলা। একসময় অফসাইড নিয়মও ছিল বিতর্কিত, পরে সেটিই খেলার ভারসাম্য এনেছিল। হয়তো এই প্রস্তাবও তেমনি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হয়ে উঠবে।

তবে কলিনার প্রস্তাব আমাদের সামনে এক প্রশ্ন তো রাখেই— ফুটবলের সৌন্দর্য কি কেবল ন্যায্যতায়, না সেই অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের মধ্যেই, যেখানে এক রিবাউন্ডে বদলে যায় পুরো ইতিহাস?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *