বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান শিক্ষা উপদেষ্টার

দেশের টেকসই উন্নয়ন, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠন এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞান ও গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার। তিনি বলেন, দেশে বিজ্ঞান শিক্ষায় ভর্তি এবং গবেষণার গতি উদ্বেগজনকভাবে কমছে। এটি কোনো জাতির জন্যই ভালো খবর নয়।

‘গবেষণা ও উন্নয়ন শক্তিশালীকরণ: সাশ্রয়ী ও উচ্চ প্রযুক্তিগত সমাধানের ব্যবহার’ শীর্ষক একটি কর্মশালা আজ বিকাল ৩টায় অর্থ বিভাগের সভা কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালাটি আয়োজন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার এবং উদ্বোধন করেন সচিব রেহানা পারভীন।

কী-নোট প্রেজেন্টেশন করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট অধ্যাপক ড. ফিরদৌসী কাদেরী, বিজ্ঞান গবেষক ড. আবেদ চৌধুরী এবং বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোবারক আহমদ খান।

কর্মশালায় ড. আবরার বলেন, গবেষণায় সক্রিয় অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অনুদান পাওয়ার পর সরকারি অনুমোদন ও ক্লিয়ারেন্স পেতে দীর্ঘসূত্রিতার মুখে পড়ে। এতে ছয় থেকে আট মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ফলে গবেষণার অর্থ দক্ষভাবে ব্যবহার করা যায় না এবং অনেক সম্ভাবনাময় কাজ মাঝপথে থেমে যায়। তিনি বলেন, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে গবেষণা ব্যবস্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় বিভাজন থাকা উচিত নয়। যেসব প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে, তাদের জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে জিডিপির প্রায় ০.৩ শতাংশ গবেষণায় বিনিয়োগ করে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় খুবই কম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি অনেক স্বল্পোন্নত দেশের চেয়েও কম—এই বাস্তবতা গভীরভাবে ভাবার মতো।

এলডিসি উত্তরণের পর ভ্যাকসিন ও স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের চাপ বাড়বে বলে উল্লেখ করেন শিক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ খাতে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। তাই বিজ্ঞান, গবেষণা ও সেন্টার অব এক্সেলেন্স গড়ে তোলাই হবে কৌশলগত পথ।

প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষকদের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়, সহযোগিতা এবং দেশে ফিরে বা দূর থেকে গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরির ওপরও তিনি জোর দেন। তার মতে, একটি শক্তিশালী গবেষণা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হলে বেসিক ও অ্যাপ্লাইড বিজ্ঞানের মধ্যে সমন্বিত সম্পর্ক এবং সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সংলাপ প্রয়োজন।

দেশে অবকাঠামোতে অতিরিক্ত জোর দিয়ে মানবসম্পদ ও গবেষক তৈরিতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগের সমালোচনা করেন তিনি। অবকাঠামো খাতে সময়মতো অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা না থাকায় প্রতিবছর বড় অঙ্কের টাকা ফেরত যায়—এটিও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেন শিক্ষা উপদেষ্টা।

ড. আবরার বলেন, গবেষণার ফল প্রকাশনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, সেগুলো বাস্তবসম্মত সমাধানে রূপ দিতে হবে। এখনই নলেজ-বেইজড ইকোনমি গড়ে তোলার সময়।

গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, যুক্তিসংগত প্রত্যাশা এবং রিভিউয়ারদের ভূমিকার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন শুধু নীতিনির্ধারক নয়, গবেষণারও সক্রিয় অংশীদার—এটিই বড় অগ্রগতি।

কর্মশালায় গবেষক, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, সঠিক সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় প্রতিভা দিয়েই নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *