টাঙ্গাইল তাঁত ও ঐতিহ্য রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি: শিক্ষা উপদেষ্টা

বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প সংরক্ষণে সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার। তিনি বলেছেন, দেশের ঐতিহ্য এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যেন তা স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হতে পারে।

বুধবার (২৮শে জানুয়ারী) দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে বাংলাদেশে ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের আয়োজনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় “টাঙ্গাইল তাঁত: ঐতিহ্যের মালিকানা ও শিল্পের সম্ভাবনা” শীর্ষক এক সংলাপ। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা ও বাংলাদেশে ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সি আর আবরার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সেক্রেটারি জেনারেল রেহানা পারভীন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মাসউদ ইমরান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, টাঙ্গাইল শাড়ি ও জামদানীর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের অর্জন নয়। এটি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জাদুঘর কর্তৃপক্ষ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। তিনি এই সাফল্যকে দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনকালীন বাস্তবতার কারণে অনুষ্ঠানটি সীমিত পরিসরে আয়োজন করা হলেও এই অর্জন যেন আড়ালে না থাকে, সেই দায়বদ্ধতা থেকেই এই সংলাপের আয়োজন। শিক্ষা উপদেষ্টা তাঁতশিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শিল্পী, কারিগর ও সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর জোর দেন।

তাঁতশিল্প রক্ষায় বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষা, ভৌগলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি, আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং এ বিষয়ে বিশেষায়িত আইনজীবী প্যানেল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি জাতীয় ঐতিহ্যের হালনাগাদ তালিকা প্রণয়ন, গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার, তাঁতশিল্পীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাক্রমে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি সহনীয় পর্যায়ে আনতে সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন। এ ছাড়া শহরভিত্তিক হ্যান্ডলুম ভিলেজ স্থাপনের প্রস্তাব দেন শিক্ষা উপদেষ্টা। তাঁর মতে, এতে উৎপাদক ও ভোক্তার সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আলোচনায় উত্থাপিত চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি দেশের ঐতিহ্য এত সহজে হারিয়ে যায়, তবে আমাদের ভিত্তি দুর্বল—এই বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। আজকের আলোচনা দেখিয়েছে, সামনে এখনও অনেক কাজ বাকি।

তিনি আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতা ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। আলোচনা শেষে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা প্রস্তাব করেন, সংলাপ থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো দুই পৃষ্ঠার একটি নথিতে সংক্ষেপ করে সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে শেয়ার করা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ সহজ হয়।

সংলাপে টাঙ্গাইল তাঁতের ঐতিহ্যের মালিকানা, সম্প্রদায়ভিত্তিক অধিকারের নৈতিক স্বীকৃতি, জিআই, ব্র্যান্ডিং ও বাজার উন্নয়ন, তাঁতশিল্পের বিদ্যমান সমস্যা এবং সমাধানের পথ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তাঁতশিল্পী, গবেষক, উদ্যোক্তা, ডিজাইনার, ফ্যাশন ও টেক্সটাইল খাতের প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *