নেপালের বাম রাজনীতিতে নতুন মোড় 

নেপালের রাজনীতিতে আবারও এক অদ্ভুত আলোড়ন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিভক্ত থাকা বামপন্থী শক্তিগুলো এবার ঐক্যের পথে হাঁটছে বলে খবর। প্রচণ্ডের নেতৃত্বাধীন সিপিএন (মাওবাদী কেন্দ্র) এবং কমরেড নেত্র বিক্রম চাঁদ ‘বিপ্লব’-এর নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (এনসিপি)—এই দুই দলের মধ্যে একীভূত হওয়ার আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। এমনকি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মাধব নেপালের দল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউনিফায়েড সোস্যালিস্ট)-এর একটি বড় অংশও এতে যুক্ত হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা ছড়িয়েছে।

নতুন ঐক্যবদ্ধ দলের নাম নিয়ে কথাবার্তা চলছে — সম্ভাব্য নাম “নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (সমাজবাদী কেন্দ্র)”। অস্থায়ী চেয়ারম্যান হতে পারেন প্রচণ্ড, আর কিছুদিন পর নেতৃত্বে আসতে পারেন কমরেড বিপ্লব। মাওবাদী কেন্দ্র ইতিমধ্যে তাদের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়েছে — যা এই ঐক্যের পথে বাস্তব প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জনযুদ্ধ থেকে সংসদীয় রাজনীতি

২০০৬ সালে মাওবাদী বিদ্রোহের অবসান এবং রাজতন্ত্রের পতনের পর নেপাল নতুন সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পথে হাঁটে। সেই প্রক্রিয়ার অন্যতম নায়ক ছিলেন প্রচণ্ড। তবে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশের পর মাওবাদীরা ক্রমে আদর্শচ্যুত হয়েছে—এমন অভিযোগ আছে তাদের পুরনো সমর্থকদের মধ্যেই।

অন্যদিকে নেত্র বিক্রম চাঁদ ‘বিপ্লব’-এর নেতৃত্বে থাকা ছোট দলটি তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক, কিন্তু তাদের মধ্যে এখনও জনযুদ্ধের আদর্শ ও ত্যাগের চেতনা জীবিত। বিপ্লবের দলকে অনেকেই “বামপন্থার নৈতিক ধারক” বলে মনে করেন—যারা রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার খেলা নয়, এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখে।

দুই ধারার মিলন—নতুন ভারসাম্য

প্রচণ্ডের নেতৃত্বে বাম রাজনীতি বরাবরই বাস্তববাদী পথে হেঁটেছে। তিনি জানেন, সংসদীয় রাজনীতিতে প্রভাব বজায় রাখতে কৌশলই মূল অস্ত্র। বিপ্লবের দল সেই বাস্তবতার বিপরীতে এক ধরনের আদর্শিক প্রতীক। এখন যদি এই দুই শক্তির ঐক্য হয়, তবে সেটি কেবল সাংগঠনিক নয়—দর্শনগত ভাবেও এক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

এই ঐক্য সফল হলে নেপালের তরুণ সমাজের কাছে বাম রাজনীতি নতুন করে বিশ্বাসযোগ্যতা পেতে পারে। কারণ গত এক দশকে নেপালের বাম দলগুলো ভোটে শক্তিশালী হলেও নৈতিক ও নীতিগত দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। ঐক্যের মাধ্যমে যদি তারা সমাজতন্ত্রের মূল চেতনা—সমতা, স্বচ্ছতা ও গণসম্পৃক্ততা—পুনরুদ্ধার করতে পারে, তাহলে নেপালের রাজনীতিতে এক নতুন দিগন্ত খুলবে।

আদর্শ না কৌশল?

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ঐক্য কি আদর্শিক বিশ্বাসের ফল, নাকি কেবল রাজনৈতিক হিসাব? নেপালের বাম রাজনীতিতে নেতৃত্ব-কেন্দ্রিক মনোভাব বরাবরই প্রবল। তাই ঐক্য টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক আস্থা ও সাংগঠনিক গণতন্ত্রই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

যা-ই হোক, প্রচণ্ড ও বিপ্লব যদি সত্যিই এক ছাতার নিচে আসেন, তাহলে এটি নেপালের বাম রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে। একদিকে জনযুদ্ধের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে সংসদীয় অভিজ্ঞতা—এই দুই ধারার মিলনে হয়তো নেপালের বামপন্থা আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *