অস্তিত্ব সংকটে প্রকাশনা শিল্প: ঈদের পরে বইমেলার দাবি প্রকাশকদের 

প্রকাশনা শিল্প আজ চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বই বিক্রি কমে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং পাঠকসংকট—সব মিলিয়ে প্রকাশকরা দাঁড়িয়ে আছেন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। এই বাস্তবতায় এবারের অমর একুশে বইমেলা ঈদুল ফিতরের পরে আয়োজনের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবে প্রকাশকরা তাদের অবস্থান তুলে ধরেছেন।

প্রকাশকরা বলছেন, বইমেলা তাদের আবেগের জায়গা হলেও বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে মেলায় অংশ নেওয়া তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তারা মনে করিয়ে দেন, ইতিহাসে শিল্প-সাহিত্য কখনোই শুধু বাজার অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকেনি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমেই উন্নত দেশগুলো শক্তিশালী পাঠক সমাজ গড়ে তুলেছে।

প্রকাশকদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো কার্যকর কোনো ‘রিডিং সোসাইটি’ গড়ে ওঠেনি। উন্নত দেশগুলো যেখানে পাবলিক লাইব্রেরি আইন, প্রকাশক সুরক্ষা আইন, রাষ্ট্রীয় বই ক্রয় নীতি ও পাবলিক লেন্ডিং রাইটের মাধ্যমে বইয়ের বাজার তৈরি করেছে, সেখানে বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রায় ৯৫ শতাংশ বইয়ের প্রথম মুদ্রণ মাত্র ৩০০ কপি। এর মধ্যেও প্রায় ৭০ শতাংশ বই সেই সংখ্যক কপিও বিক্রি করতে পারে না।

প্রকাশকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক একটি সূচকে ১০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। গত দেড় বছরে বই বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যাওয়ায় অনেক প্রকাশক নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। অনেকেই ব্যক্তিগত সঞ্চয় ভেঙে প্রকাশনা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

এমন পরিস্থিতিতে কেন তারা ঈদের পরে বইমেলা চান—সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দেন প্রকাশকরা। তাদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে রমজান ও ঈদ সামনে থাকায় সাধারণ মানুষের ব্যয় থাকে খাবার ও পোশাকে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় মেলার প্রধান পাঠক শ্রেণিও অনুপস্থিত থাকে। পাশাপাশি, মেলায় কাজ করা অধিকাংশ স্টলকর্মী শিক্ষার্থী হওয়ায় রোজা রেখে দীর্ঘ সময় কাজ করানো মানবিক নয়। ঈদের আগে তারা পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চান—এটাই স্বাভাবিক।

এ ছাড়া নির্বাচনী পরিস্থিতির কারণে শ্রমিক ও নির্মাণসামগ্রীর সংকট থাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে মেলার অবকাঠামো নির্মাণ করাও কঠিন বলে জানান তারা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই দাবি কোনো একক প্রকাশকের নয়। মোট ২৬২ জন সৃজনশীল প্রকাশক এবং বাংলাদেশ প্রকাশক সমিতি (বাপুস) একযোগে এই দাবির সঙ্গে একমত হয়েছেন।

প্রকাশকরা চার দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ঈদুল ফিতরের পরে বইমেলা আয়োজন, প্রকাশকদের আর্থিক সংকট বিবেচনায় স্টল ভাড়া মওকুফ ও সরকারি খরচে পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের বইমুখী করতে বিশেষ বই-ভাতা চালু, এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সরকারিভাবে প্রতিটি মানসম্মত বইয়ের ন্যূনতম ৩০০ কপি ক্রয়।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে সাড়া না পেয়ে প্রকাশকরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। একজন লেখক হিসেবে তিনি প্রকাশকদের কষ্ট বুঝবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

প্রকাশকদের ভাষায়, এটি কেবল ব্যবসায়িক লড়াই নয়—এটি সাহিত্য ও মননের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তারা লেখক-পাঠকসমাজকেও এই দাবিতে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রকাশকরা স্পষ্ট করে বলেন, তারা অবশ্যই বইমেলা চান, কিন্তু লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে ধ্বংস হতে চান না। ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ঈদের পরে বইমেলার বিষয়ে সরকারি ঘোষণা না এলে সাধারণ প্রকাশকদের পক্ষে এবারের মেলায় অংশ নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *