জাকির হোসেন
অফিস, আদালত, রাস্তা, হাটবাজার—সবখানেই বিশৃঙ্খলা, হৈচৈ, চিৎকার আর চেঁচামেচি। যানবাহনের শব্দে প্রতিদিনই দেশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণার নামে একযোগে একাধিক মাইক ব্যবহার—একটি নয়, দুটি নয়, একসঙ্গে তিন, চার, পাঁচটি মাইক। সারা দেশে যেন চলছে শব্দদূষণের অলিখিত প্রতিযোগিতা।
সকালের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় নানা ধরনের মাইকিং—ভর্তি চলছে, মূল্যছাড়, হরেকরকম মাল, দোকান উদ্বোধন, বিরিয়ানি ও ক্যাটারিং সার্ভিস, পুরাতন কাপড় দিয়ে হাঁড়ি-পাতিল ক্রয়, পুরাতন বই-খাতা, লোহালক্কড়, ভাঙা গ্যাসের চুলা, পুরাতন মোবাইল কেনাবেচা—এমন অসংখ্য প্রচারণায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এই অতিষ্ঠতার মধ্যেই আবার মানুষ উচ্চস্বরে কথা বলছে এমনভাবে, যেন সারা বাংলাদেশের সবাই সবাইয়ের সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত।
একাধিকবার ঘুষ ও দুর্নীতিতে বিশ্বে ‘চ্যাম্পিয়ন’ হওয়া বাংলাদেশ আজ যেন একটি অসভ্য, বর্বর সমাজে পরিণত হয়েছে—এমন অভিযোগ জনমনে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। যেখানে মেধা ও যোগ্যতা যাচাই না করে ১০, ২০ কিংবা ৩০ লাখ টাকা দিয়ে চাকরি নিতে হয়, সেখানে ঘুষ ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটবে—এটাই যেন বাস্তবতা।
যানজটে আটকে থাকা চালক ও যাত্রীদের ঝগড়া-বিবাদ সুস্থ মানুষকেও অধৈর্য করে তুলছে। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনিয়ম, অবহেলা ও স্বজনপ্রীতির শিকার হচ্ছেন। অশৃঙ্খল পরিবেশে শুধু রোগী নয়, সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বেঁচে থাকার আশায় হাসপাতালে গিয়ে অনেকেই লাশ হয়ে ফিরছেন—এমন নির্মম বাস্তবতার কথাও শোনা যাচ্ছে।
সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, দুর্ব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির চিত্র এখন তুঙ্গে। সরকারি অফিসগুলোতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ যেন অন্যায়ে রূপ নিয়েছে। নামী-দামি মানুষদের অধিকার সবসময় আগে নিশ্চিত হয়, আর সাধারণ মানুষ পিওনের কাছেই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হন। সরকারি কোনো অফিসে গেলে কর্কশ ভাষায় বলা হয়—‘স্যার নেই’, ‘ব্যস্ত আছেন’, ‘দেখা হবে না’। অনেক কর্মকর্তা দুপুরের খাবারের কথা বলে অফিস ছাড়েন, আর সেদিন আর ফেরেন না।
কয়েকদিন আগের একটি অভিজ্ঞতা বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। ‘দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্ধ, পঙ্গু, বধির, বোবা, বিধবা ও ষাটোর্ধ্ব দুস্থ নারী-পুরুষের তালিকা সংক্রান্ত বিষয়ে সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করা হলে বলা হয়—এটি তাদের কাজ নয়, উপজেলা অফিসে যেতে হবে। উপজেলা সমাজসেবা অফিস জানায়, এটি জেলা তথ্য অফিসারের কাজ। জেলা তথ্য অফিসার বলেন, এটি তাঁর কাজ নয়—আবার জেলা সমাজসেবা অফিসেই দরখাস্ত করতে হবে। শেষ পর্যন্ত জেলা সমাজসেবা উপপরিচালক একটি ‘সুন্দর উপদেশ’ দেন। সেই উপদেশ অনুযায়ী কাজের পরিকল্পনা করেই এগোতে হচ্ছে।
সারা জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখকের বক্তব্য—সরকারি অফিসের শতকরা নিরানব্বই জনকেই তিনি অসৎ হিসেবে পেয়েছেন। সেই এক শতাংশ ভালো মানুষই কেবল কিছুটা শান্তনা দেয়।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো—এই অসততা ও বৈষম্যের প্রভাব মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয়—সবখানেই দৃশ্যমান। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ঠিকাদার, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই অসৎ চর্চার অভিযোগ রয়েছে। জাতির বিবেক বলে পরিচিত সাংবাদিকতা ও ভিজ্যুয়াল মিডিয়াতেও দেখা যাচ্ছে নানা অসঙ্গতি, বৈষম্য ও স্বজনপ্রীতি। অভিযোগ রয়েছে, অসৎ সাংবাদিকেরা অসৎ উপায়ে টাকা ও রুটিরুজির ধান্দায় মত্ত।
জনসাধারণ একে অপরকে বলে—দেশটা শেষ, দেশটা শেষ। আবার নিজেরাই স্বীকার করে—আমরা জনগণই কেউ ভালো না।
এই প্রেক্ষাপটে সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ এবং কঠোরভাবে সংবিধান মেনে চলা নেতৃত্ব ও সাংসদের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। আসন্ন ১২ তারিখের নির্বাচনে দক্ষ, ধর্মনিরপেক্ষ ও সৎ প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার মাধ্যমে একটি স্বচেতন, সুন্দর ও সাবলীল সমাজ গঠনের প্রত্যাশাই এই লেখার মূল আবেদন।