লেজার লাইটের ছোঁয়ায় দৃষ্টি হারানো জিদানের গল্প

খেলনা হাতে শিশুর চোখে আনন্দের ঝিলিক থাকার কথা। কিন্তু ১০ বছর বয়সী জিদানের জীবনে সেই ঝিলিক এখন স্থায়ী অন্ধকারের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবারের এক আত্মীয়ের কাছ থেকে পাওয়া একটি লেজার লাইট খেলনা তার জীবনে যে এমন ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে, তা কেউ ভাবেনি।

ঘটনাটি এক বছর আগের। কৌতূহলী শিশুর মতোই জিদান নিজের চোখের দিকে লেজার লাইট ফেলেছিল—নিজের অজান্তেই। সে জানত না, ছোট্ট এই কাজটি তার চোখের ভেতরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ ম্যাকুলা (Macula)-কে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

প্রথম দিকে সে লক্ষ্য করেছিল—ডান চোখে ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ভয়ের কারণে বা বকা খাওয়ার আশঙ্কায় সে বিষয়টি পরিবারের কাউকে জানায়নি। সময়ের সঙ্গে সমস্যা বাড়তে থাকে। গত এক বছরে তার ডান চোখের দৃষ্টি প্রায় হারিয়ে গেছে। বর্তমানে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, শক্তিশালী চশমাও তাকে সাহায্য করতে পারছে না।

সম্প্রতি রাজধানীর একটি চক্ষু হাসপাতালে জিদানের বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, লেজার আলো চোখের রেটিনা (Retina)-র কেন্দ্রীয় অংশ ম্যাকুলায় স্থায়ী ক্ষতি করেছে। এই অংশটি মূলত আলো এবং সূক্ষ্ম রঙ শনাক্ত করার কাজ করে থাকে। ফলে চোখের অংশের ক্ষতি হলে চোখের কেন্দ্রীয় দৃষ্টি বা স্পষ্ট দেখার ক্ষমতা হারিয়ে যায়।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. শারমিন সুলতানা, বলেন—

“অনেকেই মনে করেন খেলনা লেজার লাইট নিরীহ। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব লাইটে ব্যবহৃত লেজারের শক্তি মান নিয়ন্ত্রণহীন। শিশু যদি সেটি চোখে ফেলে, কয়েক সেকেন্ডেই স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। ম্যাকুলা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, লেজার লাইটের রশ্মি চোখের ভেতর দিয়ে সরাসরি রেটিনায় গিয়ে তাপ উৎপন্ন করে। রেটিনার কোষগুলো তাপ-সংবেদনশীল; ফলে সেগুলো পুড়ে যায় বা স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এ কারণেই লেজার পয়েন্টার, খেলনা বন্দুক বা পার্টির লেজার ডিভাইস শিশুদের হাতে দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ চক্ষু বিজ্ঞান সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে লেজার লাইটের কারণে শিশুদের চোখে দৃষ্টি ক্ষতির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক সময় অভিভাবকেরা ঘটনাটি প্রথমে টেরই পান না, কারণ শিশু নিজের ভুল স্বীকার করতে চায় না।

ডা. শারমিন বলেন,

“শিশুদের চোখের দৃষ্টি হঠাৎ কমে গেলে বা তারা এক চোখে ঝাপসা দেখছে—এমন অভিযোগ এলে তা অবহেলা করা যাবে না। দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।”

জিদানের পরিবার এখন তাকে নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছে—কোথাও কোনো চিকিৎসা বা প্রযুক্তির মাধ্যমে তার দৃষ্টি আংশিক ফেরানো যায় কিনা তা খুঁজে দেখতে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ম্যাকুলার ক্ষতি একবার হয়ে গেলে তা আর পূর্ণাঙ্গভাবে সারানো সম্ভব নয়।

সতর্কতার আহ্বান

  • খেলনা বা বাজারে বিক্রিত লেজার লাইট শিশুর হাতে দেবেন না।

  • স্কুল বা পার্টিতে লেজার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে সচেতন থাকতে হবে।

  • শিশুদের শেখাতে হবে—লেজার কখনো নিজের বা অন্যের চোখের দিকে তাক করে ফেলতে নেই।

খেলনা নয়, লেজার লাইট এখন শিশুদের জন্য সম্ভাব্য বিপদের উৎস। জিদানের মতো আরও অনেক শিশু হয়তো এমন অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—অবচেতনেই। এর নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার থামাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও অভিভাবকদের একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে—যাতে আগামী প্রজন্মের চোখে অন্ধকার না নেমে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *