ওয়েব ডোমেইনে বদলে গেল অ্যাঙ্গুইলার ভাগ্য

ক্যারিবিয়ান সাগরের মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা একখণ্ড ছোট দ্বীপ — নাম তার অ্যাঙ্গুইলা (Anguilla)। জনসংখ্যা মাত্র পনেরো হাজারের মতো। কয়েক বছর আগেও বিশ্বের মানচিত্রে এই দ্বীপের নাম উচ্চারণ করতেন কেবল পর্যটক আর সাগরপাড়ের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এখন সেই একই দ্বীপ আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে — কারণ, এর দেশীয় বাজেটের প্রায় অর্ধেক অর্থ আসছে শুধু ওয়েবসাইটের ডোমেইন বিক্রি থেকে!

এক অবিশ্বাস্য সূচনা

প্রত্যেক দেশের মতো অ্যাঙ্গুইলারও একটি নির্দিষ্ট কান্ট্রি কোড টপ-লেভেল ডোমেইন (ccTLD) আছে — তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে “.ai”। ২০১০ সালের আগে কেউ এই ডোমেইন নামের দিকে তেমন নজরই দিত না। কয়েকটি স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর প্রযুক্তি কোম্পানি মৃদু আগ্রহ দেখাতো, ব্যস এতটুকুই।

কিন্তু ইতিহাস বদলে যায় ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে, যখন ChatGPT আত্মপ্রকাশ করে এবং গোটা বিশ্বে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব AI জোয়ার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) শব্দদুটি প্রযুক্তি বিশ্বের প্রতিটি কোণে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আর ঠিক তখনই, সেই ছোট্ট দ্বীপ অ্যাঙ্গুইলার “.ai” ডোমেইন হয়ে ওঠে এক ডিজিটাল সোনার খনি।

ডিজিটাল রিয়েল এস্টেট

যেভাবে বড় শহরে জমির দাম হঠাৎ আকাশচুম্বী হয়ে যায়, ঠিক সেভাবেই বেড়ে যায় এই “ডিজিটাল জমি”র দামও।
২০১৮ সালে বিশ্বজুড়ে .ai ডোমেইনের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৮,০০০।
২০২৩ সালে গিয়ে সেই সংখ্যা পৌঁছায় ৮ লাখ ৭০ হাজারে!

এমনকি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে —
অ্যাঙ্গুইলার ২০২৫ সালের জাতীয় বাজেট প্রায় ৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এর প্রায় অর্ধেক অর্থই আসবে .ai ডোমেইন বিক্রি থেকে!

IMF জানাচ্ছে,

  • ২০২২ সালে .ai থেকে আয় ছিল দেশের বাজেটের মাত্র ১ শতাংশেরও কম।

  • ২০২৩ সালে আয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩২ মিলিয়ন ডলার।

  • ২০২৪ সালে তা আরও বাড়ে, প্রায় ৩৯ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।

  • আর ২০২৫ সালে এই আয় ৪৫ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অ্যাঙ্গুইলার সরকারি অর্থনীতি বিভাগ বলছে, শুধু ডোমেইন বিক্রিই নয়, নবায়ন ফি (renewal fee) এবং প্রিমিয়াম নাম বিক্রির মাধ্যমেও আয় হচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা।

পর্যটনের পর নতুন উৎস

অ্যাঙ্গুইলার মূল অর্থনীতি এত দিন পর্যন্ত নির্ভর করত পর্যটন, মৎস্যসম্পদ এবং বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর।
কিন্তু এখন সেই নির্ভরতার চিত্র বদলে যাচ্ছে।
দেশটি নতুন করে পরিকল্পনা নিচ্ছে কীভাবে এই ডোমেইন রাজস্বকে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানিতে কাজে লাগানো যায়।

স্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন,

“আমরা কখনও ভাবিনি .ai এত মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবে। এটি এখন আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তি।”

পুরনো গল্প, নতুন পরিণতি

এই প্রথম নয়—প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপ টুভালু (Tuvalu) তাদের .tv ডোমেইন বিক্রি করে বিপুল অর্থ আয় করেছিল। আবার চাগোস দ্বীপপুঞ্জের .io ডোমেইনও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
তবে AI-উন্মাদনার যুগে অ্যাঙ্গুইলার উত্থান অন্য সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক করছেন।
যদি ভবিষ্যতে AI নিয়ে আগ্রহ কমে যায়, বা নতুন কোনো প্রযুক্তি ডোমেইন মার্কেটের ধারা বদলে দেয়, তাহলে এই রাজস্ব উৎস দ্রুত হ্রাস পেতে পারে।
তবে আপাতত অ্যাঙ্গুইলার অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এই আয় স্থায়ীভাবে ধরে রাখার জন্য সরকার ইতিমধ্যে একটি বিশেষ ডিজিটাল ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড গঠন করছে।

একসময় সমুদ্রপাড়ের নিঃশব্দ দ্বীপ ছিল অ্যাঙ্গুইলা। আজ সেই দ্বীপ প্রযুক্তির ঢেউয়ে চড়ে বিশ্বের অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে জায়গা করে নিয়েছে।

এটি প্রমাণ করেছে — ডিজিটাল সম্পদও প্রাকৃতিক সম্পদের মতোই মূল্যবান হতে পারে, যদি তা সঠিকভাবে চিনে নেওয়া যায়।

যে দ্বীপ একসময় পরিচিত ছিল নীল সাগর আর সাদা বালির জন্য, আজ সেটি পরিচিত একটি ছোট্ট ডট —
“.ai” — যা এখন পুরো অ্যাঙ্গুইলার ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *