প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতিটি স্কুলকে একটি অটোনোমাস বডির মতো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। তিনি বলেন, একজন প্রধান শিক্ষক যদি টিমওয়ার্কের মাধ্যমে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে কাজ করতে পারেন, তাহলে বিদ্যালয় পরিচালনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। সে জন্য স্কুলগুলো স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোয় কাজ করলে শিক্ষার মান আরও ভালো হবে।
আজ জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশা-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার শিক্ষণ ও শিখনগত এবং অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. বিধান রঞ্জন রায় বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে জনবল। সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে এবং দক্ষ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ মানবসম্পদ গড়ে না উঠলে রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি জানান, শিক্ষার মান উন্নয়নে কন্ট্যাক্ট আওয়ার বৃদ্ধি, একাধিক শিফটের পরিবর্তে এক শিফটে বিদ্যালয় পরিচালনা, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানোর মতো বিষয়ে সরকার কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, এ গবেষণার তথ্য নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে। তবে গবেষণার উদ্দেশ্য শুধু নীতিনির্ধারণ নয়; এনজিও, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা, যাতে শিক্ষকদের শিক্ষার বাইরে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার না করার বিষয়ে সরকারের ওপর ইতিবাচক চাপ তৈরি হয়। তিনি স্বীকার করেন, শিক্ষা খাতে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে, যা এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়; জাতীয় পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ।
গবেষণায় উঠে এসেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মোট ৩৭ ধরনের নন-প্রফেশনাল বা পেশা-বহির্ভূত কাজ করতে হয়। প্রধান শিক্ষকরা সহকারী শিক্ষকদের তুলনায় বেশি সময়—গড়ে ২৭ দশমিক ৭৪ ঘণ্টা—এ ধরনের কাজে ব্যয় করেন। এসব কাজে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কমে যায়। দাপ্তরিক কাজ শেষে শ্রেণিকক্ষে ঢোকার পর প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষক পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের শেখার ওপর।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত। এসব শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ ক্লাস প্রয়োজন হলেও ৮৫ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, নন-প্রফেশনাল কাজের চাপে তারা এই বিশেষ ক্লাস নিতে পারছেন না।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরে প্রায় ১৯ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন টাকার সমমূল্যের শিক্ষক শ্রম প্রশাসনিক কাজে ব্যয় হচ্ছে। একজন সহকারী শিক্ষক প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪ হাজার ১১৬ টাকা সমপরিমাণ সময় অ-পেশাদার কাজে ব্যয় করেন, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় ৪৯ হাজার ৩৯৫ টাকা। সারা দেশে ৩ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষকের ক্ষেত্রে এই ব্যয় বছরে প্রায় ১৭১ কোটি টাকার বেশি। এটি শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ হলেও এর সুফল সরাসরি শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না।
গবেষণা প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে—ক্লাস চলাকালীন কোনো ধরনের তথ্য সংগ্রহ বা প্রশাসনিক কাজ শিক্ষকদের ওপর না চাপানো, প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী বা ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ, একক ডিজিটাল পোর্টালের মাধ্যমে সব দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করা এবং শিক্ষকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ চালু করা। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষকদের পাঠদানের সময় সুরক্ষায় একটি ‘Teaching Hour Protection Policy’ প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।