এপস্টিন নথি: গুঞ্জন, দাবি ও প্রশ্ন

মারুফ আহমেদ

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনকে ঘিরে সম্প্রতি ৩০ লাখের বেশি নথি প্রকাশের দাবি সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় তুলেছে। বিভিন্ন অনলাইন পোস্ট ও আলোচনা অনুযায়ী, এসব নথিতে বিশ্বের প্রভাবশালী বহু রাজনৈতিক ও ক্ষমতাধর ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে—যাদের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, মাইক্রোসফটের বিল গেটস, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনী, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে।

এই বিতর্কের ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক আলোচনায় যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া দাবি অনুযায়ী, এপস্টিনের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করা এক নারী সহকর্মী লেসনি গ্রো ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১টায় পাঠানো একটি ইমেইলে এপস্টিনের টিমের সঙ্গে ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ কোনো একটি অজ্ঞাত বিষয়ে একমত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। ইমেইলটির বিষয়বস্তু বা সেই অজ্ঞাত বিষয়টি কী—তা সেখানে খোলাসা করা হয়নি। উল্লেখ্য, ওই ইমেইলে সরাসরি শেখ হাসিনার নাম লেখা হয়নি; ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে।

অনলাইন দাবিতে আরও বলা হচ্ছে, ২০১৮ সালে নরওয়ে বৈঠক উপলক্ষে লন্ডন সফরের সময় এপস্টিন-সংক্রান্ত ফাইলসে এই উল্লেখ পাওয়া গেছে। তবে এসব নথির প্রেক্ষাপট, সত্যতা এবং আইনি ব্যাখ্যা সম্পর্কে এখনো নির্ভরযোগ্য ও যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

কে এই জেফ্রি এপস্টিন?

জেফ্রি এপস্টিন ছিলেন নিউইয়র্কভিত্তিক এক ধনী আর্থিক বিনিয়োগকারী। তার বিরুদ্ধে নাবালিকাদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন, মানবপাচার ও যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ অভিযোগ ছিল। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় অপ্রাপ্তবয়স্ক এক কিশোরীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। তবে বিতর্কিত এক সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে মাত্র ১৩ মাসের হালকা সাজা ভোগ করে মুক্তি পান। পরে জানা যায়, ওই চুক্তির ফলে তিনি বহু গুরুতর অভিযোগ থেকে রেহাই পান—যা যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও স্থানীয় প্রসিকিউশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

২০১৯ সালে নিউইয়র্কে এপস্টিনের বিরুদ্ধে আবারও নাবালিকাদের যৌন পাচারের অভিযোগে বড় ধরনের মামলা হয়। এফবিআই ও ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগে বলা হয়, তিনি বহু বছর ধরে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরীদের বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তার বাড়ি ও ব্যক্তিগত বিমানে এনে নির্যাতন করতেন। তদন্তে আরও উঠে আসে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন তার অপরাধচক্র আড়াল করে রেখেছিলেন।

রহস্যজনক মৃত্যু ও পরবর্তী ঘটনা

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে ২০১৯ সালের আগস্টে। নিউইয়র্কের একটি কারাগারে এপস্টিনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সরকারি তদন্ত ও মেডিক্যাল পরীক্ষায় একে আত্মহত্যা বলা হলেও কারাগারের নিরাপত্তা ত্রুটি, নজরদারির ব্যর্থতা, ক্যামেরা বিকল থাকা এবং প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলার মতো একাধিক অসঙ্গতি সামনে আসায় তার মৃত্যুকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

এপস্টিনের সহযোগী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলকে ২০২০ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে নাবালিকাদের যৌন পাচারসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং বর্তমানে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

গুঞ্জন, রাজনীতি ও সামাজিক মাধ্যম

এপস্টিনের মৃত্যু ঘিরে প্রশ্নের মেঘ এখনো কাটেনি। বরং নতুন করে নথি প্রকাশের দাবিকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে আবারও এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে—‘এপস্টিন, এপস্টিন, এপস্টিন’। অনেকের চোখে এটি বিশ্বের ক্ষমতার অন্দরমহলের ভয়াবহ এক চিত্র, আবার কারও কাছে এটি তথ্যের চেয়ে গুজবের বিস্তার।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা নতুন রাজনৈতিক প্রশ্নও তুলেছে। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে কি এই ইস্যু ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে? নাকি এটি কেবল সামাজিক মাধ্যমকেন্দ্রিক কৌতূহল ও অতীতের নানা ‘ভাইরাল থ্রিলার’-এর মতোই আরেকটি ঢেউ? ‘রাসেল ভাইপার’ ইস্যুর মতো আলোচনাও টানছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—এপস্টিনকে ঘিরে সাম্প্রতিক নথি প্রকাশের দাবি কতটা যাচাইকৃত, আর কতটাই বা গুজব? সত্যের অনুসন্ধানই এখানে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *