বিজয় মজুমদার
২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে। ভারত ও শ্রীলঙ্কা এবারের টুর্নামেন্টের যৌথ আয়োজক। শিরোপার দাবিদার হিসেবে আলোচনায় আছে আয়োজক ভারতসহ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতবে, তা জানা যাবে ফাইনালে। তবে একটি বিষয় টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই স্পষ্ট—এবার সবার আগে পরাজিত হয়েছে খোদ বিশ্বকাপ নিজেই।
কারণ, ক্রিকেট ইতিহাসে এমন বিতর্কিত বিশ্বকাপ আগে কখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে কি না, তা বলা কঠিন।
এই বিতর্কের সূত্রপাত বাংলাদেশের পেস বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়ার অন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে। ভারতীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী কিছু নেতা প্রথমে আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন, যেন তারা মুস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেয়।
পরবর্তীতে ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সভাপতি একই ধরনের হুমকি দিলে কলকাতা নাইট রাইডার্স মুস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়।
বাস্তবতা হলো, মুস্তাফিজুর রহমান একজন ভদ্র, শৃঙ্খলাবান ও কার্যকরী ক্রিকেটার। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ নেই। তবুও বাংলাদেশে হিন্দুদের নির্যাতনের অভিযোগ তুলে একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে বাদ দিতে বাধ্য করানো—এবং তাতে সফল হওয়া—উগ্রবাদী রাজনীতিরই এক ধরনের বিজয়।
এই ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ সরকার আইসিসির কাছে অনুরোধ জানায়, যেন বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর করা হয়। যুক্তি ছিল পরিষ্কার—যে ভারত একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে নিরাপত্তা দিতে অক্ষম বলে দাবি করে তাঁকে আইপিএল দল থেকে বাদ দিতে বাধ্য করে, সেই ভারতই আবার কীভাবে পুরো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নিরাপত্তা দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে?
তবে আইসিসির অবস্থান ছিল ভিন্ন। যেহেতু ভারত আইসিসির তহবিলে সবচেয়ে বেশি অর্থ যোগান দেয়, তাই বাংলাদেশের দাবি তারা গ্রহণ করেনি। মুস্তাফিজ ইস্যুতে আইসিসি সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করে। একজন প্রকৃত ক্রিকেটারকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি তারা কার্যত ক্রিকেটের স্পিরিট ধ্বংস করতেও সহায়তা করেছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার কঠোর অবস্থান নেয় এবং ভারতে দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। এখানেও আইসিসির ডাবল স্ট্যান্ডার্ড স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতীতে ভারত যখন নিরাপত্তার অজুহাতে পাকিস্তানে বিশ্বকাপ খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তখন আইসিসি অনায়াসেই ভারতের ম্যাচ অন্য দেশে সরিয়ে নিয়েছে। অথচ একই ধরনের দাবি উত্থাপিত হলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তারা ‘ভোটের নীতি’ অনুসরণ করে।
বিশ্বকাপে দ্বিতীয় বড় ধাক্কা আসে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে। পাকিস্তান আইসিসিকে জানায়, তারা এই বিশ্বকাপে ভারতের সঙ্গে ম্যাচ বয়কট করবে। বাস্তবে এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে আইসিসির তেমন কিছু করার ছিল না। কারণ অতীতে বড় দলগুলো রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত অজুহাতে ম্যাচ না খেললেও আইসিসি কেবল নামমাত্র শাস্তি দিয়েছে—সাধারণত কিছু পয়েন্ট কেটে নেওয়ার মধ্যেই তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল।
ফলে আইসিসির দুর্বলতা, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও দ্বৈত নীতির কারণে এবারের বিশ্বকাপ পরিণত হয়েছে সবচেয়ে বিবর্ণ ও বিতর্কিত এক টুর্নামেন্টে। ইতিহাসে এই বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকবে ক্রিকেটীয় নৈপুণ্যের জন্য নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনীতির নগ্ন হস্তক্ষেপের প্রতীক হিসেবে।