তারেক রহমান: নির্বাসন থেকে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে

প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনের ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছেন। আগামী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের হাত ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন মোড় নিচ্ছে।

গতবছর বড়দিনে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেন জনসমুদ্র দেখা গেল। লন্ডন থেকে আসা একটি ফ্লাইটের অপেক্ষায় ছিল লাখো সমর্থক। বিমানবন্দর থেকে নগরীর ভেতর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে মানুষের ঢল, হাতে হাতে বিএনপির ঝান্ডা—এই দৃশ্য ছিল তারেক রহমানের ১৭ বছর পর দেশে ফেরার দিনের।

বিমানবন্দরে নামার পর তিনি জুতো খুলে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন, হাতে তুলে নেন এক মুঠো মাটি। এই প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ও নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

তারেক রহমানের এই ফেরা কেবল ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরাট মোড়। ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়া এই নেতা আর ফিরতে পারেননি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছিল অর্থ পাচার, দুর্নীতি ও গ্রেনেড হামলার মতো মামলা। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের পর তার সব দণ্ড বাতিল হয়ে যায়।

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও সংগ্রাম

তারেক রহমান জন্মেছিলেন ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায়। বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি, মা বেগম খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। এই রাজনৈতিক পরিবারে বড় হওয়া তারেক ১৯৮০-এর দশকের শেষে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মায়ের শাসনামলে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে ২০০৭-০৮ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হন। কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়ে স্পাইনাল সমস্যায় আক্রান্ত হন, যা আজও তাকে কষ্ট দেয়।

২০০৮ সালে চিকিৎসার নামে লন্ডনে গিয়ে সেখানেই থেকে যান। প্রবাস থেকে দল পরিচালনা করেন। ২০১৮ সালে মা বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে দলীয় সভা পরিচালনা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া—এভাবেই প্রায় দুই দশক ধরে দলকে টেনে নিয়ে গেছেন।

অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থান পাল্টে দেয় দেশের রাজনৈতিক ভূগোল। চাকরির কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। হাসিনা এখন ভারতে পলাতক।

এই শূন্যতায় তারেক রহমানের ফেরা এক নতুন সম্ভাবনার সঞ্চার করে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করলেও, আগামী নির্বাচনে ক্ষমতার দাবিদার হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে বিএনপি।

সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বিএনপির জনসমর্থন প্রায় ৪২-৭০ শতাংশ। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে অনেক এগিয়ে তারা।

পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান জানিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব পুনর্বিন্যাস করতে চান। শেখ হাসিনার ভারত-নির্ভর পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে তিনি কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের পথ খুঁজবেন।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার পরিকল্পনা ব্যাপক। পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পের বিকাশ ঘটাতে চান। দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ দুই মেয়াদে ১০ বছর সীমিত রাখা—এসব তার নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ।

পরিবেশগত পরিকল্পনাও চোখে পড়ার মতো। ঢাকায় ৫০টি নতুন উদ্যান, বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানো, ১২ হাজার মাইল খাল খননের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা তার।

চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা

তবে পথ সহজ নয়। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে পুরনো দুর্নীতির অভিযোগ এখনো শোনা যায়। ২০০১-০৬ সালের বিএনপি আমলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল চার বছর ধরে বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তাকে নিয়ে “খাম্বা তারেক” নামে কুখ্যাতি ছড়িয়েছিল—বিদ্যুতের খুঁটি কেলেঙ্কারির অভিযোগে।

২০০৮ সালের একটি ফাঁস হওয়া মার্কিন কূটনৈতিক কেবলে তাকে “দুঃশাসন ও সহিংস রাজনীতির প্রতীক” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।

অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত সংগ্রামে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১,৪০০ মানুষ। এই ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে আবারও একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের শাসন কামনা করে কি না তরুণ প্রজন্ম, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের মা বেগম খালেদা জিয়ার মতো জনসমর্থন ও নেতৃত্বের গুণ তিনি এখনো অর্জন করতে পারেননি। দলের ভেতরেও প্রজন্মগত বিভাজন দেখা দিচ্ছে। ৭৯টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন, যা দলীয় শৃঙ্খলার অভাবকে তুলে ধরে।

ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?

তারেক রহমান নিজে বলেছেন, “আমি জানি না আমরা কীভাবে প্রতিটি মিনিট কাটিয়েছি।” দ্রুত পরিবর্তনশীল এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি নিজেও সম্ভবত হিমশিম খাচ্ছেন।

তবে তার দাবি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। “গণতন্ত্র চর্চা করলেই আমরা সমৃদ্ধি ও পুনর্গঠন করতে পারব। গণতন্ত্র চর্চা করলে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে পারব।”

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একটি সংক্রমণকাল অতিক্রম করছে। শেখ হাসিনার পতনের পর ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রভাব বৃদ্ধি, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, অর্থনৈতিক সংকট—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন সরকারকে।

তারেক রহমান যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তবে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার নন, বরং বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশার প্রতিনিধি। ১৭ বছরের নির্বাসন তাকে হয়তো পরিবর্তিত করেছে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি তাকে কতটা গ্রহণ করবে, তা সময়ই বলে দেবে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, দ্য ডিপ্লোম্যাট, টাইম ম্যাগাজিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *