উল্লাসের মানচিত্রে বিজয় কার?
প্রথম নজরে যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটা হলো—গাজার রাস্তায় উল্লাস, হাসি আর চোখের জল মিশে একাকার।
যুদ্ধবিরতির খবর শুনে মানুষ ছুটে যাচ্ছে প্রতিবেশীর বাড়িতে, সাংবাদিকরা হাঁটছেন অন্ধকার রাতে—মুখে শান্তির খবর।
অন্যদিকে ইজরাইলজুড়ে নেমে এসেছে এক ধরনের ভারী নীরবতা।
কেবল কিছু পরিবার আছে, যারা তাদের প্রিয়জনের মুক্তির আশায় একটু স্বস্তি পাচ্ছে—কিন্তু সেটি যুদ্ধজয়ের আনন্দ নয়, বরং দীর্ঘ আতঙ্কের পর একটুখানি স্বস্তি।
ইজরাইলি সমাজের ভেতর হতাশা এখন স্পষ্ট।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুদ্ধজয়ের বুলি আওড়ালেও সেই নাটক বিশ্বাস করছে না তার সেনা, তার মন্ত্রিসভা, এমনকি জনগণও।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনি সমাজের হাসি এখনো ক্ষুধা, অভাব আর ধ্বংসের মাঝেও জীবনের আশায় ঝলমল করছে।
প্রথম প্যারামিটারেই দেখা যায়—যে জাতির মুখে হাসি, তারা অন্তত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে জিতেছে।
কার উদ্দেশ্য কতটা পূর্ণ হলো?
হামাসের লক্ষ্য
হামাসের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল একটাই—মানচিত্রে ও মানুষের মুখে ফিলিস্তিনকে ফেরানো।
২০২৩ সালে জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর দেখানো সেই মানচিত্রে ফিলিস্তিন ছিল না।
আজ দুই বছর পর, সেই ‘অস্তিত্বহীন’ ভূখণ্ডই হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক প্রতীকের নাম।
যে আরব শাসকেরা একসময় ফিলিস্তিনের কথা মুখে আনতেন না, তাদের রাজপথ আজ ফিলিস্তিনের পতাকায় মুখর।
পশ্চিমে-পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়, রাস্তাঘাট, এমনকি কনসার্ট পর্যন্ত উচ্চারণ করছে—“ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি, প্যালেস্টাইন উইল বি ফ্রি।”
একসময় ভুলে যাওয়া একটি জাতি আজ বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে।
এটাই হামাসের সবচেয়ে বড় অর্জন।
তাদের দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল তথাকথিত “আব্রাহাম একর্ডস”—অর্থাৎ আরব-ইজরাইল সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ—থামানো।
সেটিও এখন কার্যত স্থগিত।
রিয়াদ থেকে কায়রো—সব জায়গায় নতুন করে হিসাব কষা শুরু হয়েছে।
ইজরাইলের লক্ষ্য
ইজরাইলের উদ্দেশ্য ছিল তিনটি:
১. বন্দিদের মুক্তি
২. হামাসকে নিশ্চিহ্ন করা
৩. গাজাকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করা
এই তিনটির কোনোটিই পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। কিছু বন্দি মুক্ত হয়েছে, কিন্তু অনেকেই এখনো বন্দি।
হামাস দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শেষ হয়নি। বরং গেরিলা যুদ্ধের জন্য সংগঠনটি এখন আরও বিস্তৃত নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়েছে।
নৈতিক পরাজয়ই সবচেয়ে বড় ক্ষতি
আজকের দিনে ইজরাইলের সবচেয়ে বড় ক্ষতি সামরিক নয়, নৈতিক।
যে রাষ্ট্র একসময় “উন্নত টেকনোলজির প্রতীক” ছিল, সেটিই এখন “গণহত্যাকারী রাষ্ট্র” হিসেবে পরিচিত।
ইউরোপের ক্যাফেতে ইজরাইলি পাসপোর্টধারীদের প্রতি বিরূপতা, কর্পোরেট চুক্তি বাতিল, শিক্ষাঙ্গনে প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে এক অঘোষিত অবরোধ তৈরি হয়েছে।
এই অবরোধ রকেট দিয়ে নয়, এসেছে বিবেকের প্রাচীর দিয়ে।
এটিই ইজরাইলের প্রকৃত পরাজয়।
এক নতুন ভূরাজনীতির সূচনা
এই যুদ্ধবিরতি কোনো স্থায়ী শান্তির প্রতীক নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতার সূচনা।
এখন “ফিলিস্তিন” কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়, এটি এক প্রতিরোধের প্রতীক।
ইজরাইল বুঝে গেছে—অস্ত্র দিয়ে ভূমি দখল করা যায়, কিন্তু একটি জাতির স্বপ্ন হত্যা করা যায় না।
যুদ্ধবিরতির এই মুহূর্তে ইতিহাস যেন নতুন খাতা খুলছে।
যেখানে শক্তি নয়, ন্যায়ই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের ভারসাম্য।
দুই বছর আগে পৃথিবী মনে করেছিল—ইজরাইল অজেয়। আজ পৃথিবী জানে, ইজরাইলও পরাজিত হতে পারে।
আর ফিলিস্তিন?
সে এখন কেবল গাজার ধ্বংসস্তূপে নয়, কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি—প্যালেস্টাইন উইল বি ফ্রি।