মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে নতুন আইন-নীতিমালা, খামারিদের বিদ্যুতে ২০% রিবেট

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বল্প পরিসরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে একাধিক আইন, অধ্যাদেশ ও নীতিমালা প্রণয়ন বা সংশোধন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। টেকসই উৎপাদন, সম্পদ সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রান্তিক খামারিদের স্বার্থরক্ষায় এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।

উপদেষ্টা জানান, ‘মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও ২০২৬’ জারির মাধ্যমে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা, ইলেক্ট্রোফিশিং নিষিদ্ধকরণ এবং এলাকাভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা আইনগত স্বীকৃতি পেয়েছে।

এছাড়া ‘জাতীয় মৎস্য নীতিমালা, ২০২৬’, ‘জাতীয় মৎস্য পদক নীতিমালা, ২০২৬’, ‘মৎস্যখাদ্য বিধিমালা, ২০২৪’, ‘মৎস্য সঙ্গনিরোধ বিধিমালা, ২০২৪’ এবং ‘মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

সামুদ্রিক জলসীমায় মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা ৬৫ দিনের পরিবর্তে ৫৮ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। গভীর সমুদ্র ছাড়া বাণিজ্যিক ট্রলারে দুই বছরের জন্য SONAR ব্যবহার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইলিশ সংরক্ষণে পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় ছয়টি অভয়াশ্রম এবং বঙ্গোপসাগরে সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর আছে। দেশে বর্তমানে ৬৬৯টি মাছের অভয়াশ্রম পরিচালিত হচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদে উৎপাদন বাড়াতে রয়েছে সাতটি অভয়াশ্রম। তবে হ্রদটি এখনো অবৈধ দখল ও দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

হালদা নদীকে ‘মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করে ৫ নভেম্বর ২০২৫ গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৬টি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে হালদা থেকে প্রায় ১৪ হাজার কেজি মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। এ নদী জাতীয় অর্থনীতিতে ৮০০ কোটির বেশি অবদান রাখছে বলে জানান উপদেষ্টা।

প্রাণিসম্পদ খাতে ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা, ২০২৬’, ‘প্রাণী ও প্রাণিজাত পণ্য সঙ্গনিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’, ‘জাতীয় প্রাণিসম্পদ বীমা নীতিমালা, ২০২৬’, ‘জাতীয় কৃত্রিম প্রজনন নীতিমালা, ২০২৬ (খসড়া)’ এবং ‘ভেটেরিনারি ঔষধ অধ্যাদেশ, ২০২৬ (খসড়া)’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

পশুর প্লেগ (PPR) রোগ নির্মূলে তিন কোটি ৬১ লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। ক্ষুরারোগ নিয়ন্ত্রণে ৪৬ লাখের বেশি ডোজ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া গবাদিপশুর ১৭টি রোগের বিরুদ্ধে তিন কোটি ছয় লাখের বেশি ডোজ টিকা এবং হাঁস-মুরগির জন্য ৫৩ কোটির বেশি ডোজ টিকা উৎপাদন করা হয়েছে।

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্স মোকাবিলায় স্টুয়ার্ডশিপ গাইডলাইন ও স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন চালু করা হয়েছে। জুনোটিক রোগ নির্ণয় ও নজরদারির জন্য বিশেষায়িত ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে।

উৎপাদন ব্যয় কমাতে খামারিদের বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ রিবেট এবং ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা মিলবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।

জেলেদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৩ লাখ ২৬ হাজার ৪৮৬ জন থেকে বাড়িয়ে ১৫ লাখে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর এলাকার জেলেরা নিষেধাজ্ঞার সময় ভিজিএফ সুবিধা পাবেন।

রমজান মাসে ২৬ দিন ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ২৪৫ টাকা কেজি দামে ব্রয়লার মুরগি, ৮০ টাকা লিটার দুধ, ৮ টাকা পিস ডিম এবং ৬৫০ টাকা কেজি দামে গরুর মাংস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হবে।

২০২৫ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত COP30 সম্মেলনে প্রথমবারের মতো মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় অংশ নেয়। উপদেষ্টা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন সরাসরি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ওপর পড়ছে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখার পরও এ খাত এখনো ‘কৃষির উপখাত’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই খাতটিকে পূর্ণাঙ্গ খাতের মর্যাদা দিতে প্রধান উপদেষ্টা ও পরিকল্পনা কমিশনের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের উপস্থাপনা দেন। এ সময় অতিরিক্ত সচিব মো. ইমাম উদ্দীন কবীর, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফ এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *