২০২৫ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন হাঙ্গেরিয়ান লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। স্টকহোমে বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করে সুইডিশ একাডেমি জানিয়েছে, তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে—
“তাঁর অনিবার্য এবং দূরদর্শী কাজের জন্য, যা মহাপ্রলয়ঙ্করী ভয়ের মধ্যেও শিল্পের শক্তিকে আবারও দৃঢ় করে।”
সাহিত্য ও দর্শনের সংমিশ্রণ
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যের এক অনন্য কণ্ঠস্বর। তাঁর লেখায় নৈরাশ্য, অস্তিত্ববোধ ও মানবজীবনের অস্থিরতার গভীর বিশ্লেষণ মিশে আছে। নোবেল কমিটি তাঁকে বর্ণনা করেছে একজন “চিন্তাশীল, সূক্ষ্মভাবে পরিমিত স্বর গ্রহণকারী লেখক” হিসেবে—যিনি সমাজ ও মানবতার পতনকেও শিল্পের নান্দনিক শক্তিতে রূপ দিতে পারেন।
প্রারম্ভিক জীবন ও সাহিত্যযাত্রা
১৯৫৪ সালে রোমানিয়ার সীমান্তঘেঁষা দক্ষিণ-পূর্ব হাঙ্গেরির জিউলা শহরে জন্মগ্রহণ করেন ক্রাসনাহোরকাই। ছোটবেলার নিঃসঙ্গতা ও প্রান্তিক জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি বুদাপেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। তরুণ বয়সে কবিতা ও ছোটগল্প লিখে শুরু করলেও, পরে উপন্যাসে নিজের মৌলিক স্বর খুঁজে পান।
ব্রেকথ্রু কাজ: সাতানটাঙ্গো
১৯৮৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস সাতানটাঙ্গো হাঙ্গেরীয় সাহিত্যে যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পতনের ঠিক আগমুহূর্তে হাঙ্গেরির এক পরিত্যক্ত সমবায় খামারে বসবাসরত একদল দরিদ্র মানুষের জীবনচিত্র তিনি এখানে এঁকেছেন।
নিরাশা, বিভ্রম ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানবজীবনের স্থিতিশীলতা ও অর্থ খোঁজার প্রচেষ্টাই এই উপন্যাসের মূল সুর। সমালোচকেরা একে আধুনিক যুগের ডিভাইন কমেডির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
সাতানটাঙ্গো পরে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা বেলা টার-এর হাতে সিনেমায় রূপ পায়, যা প্রায় সাত ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘতম চলচ্চিত্রগুলোর একটি।
‘অ্যাপোক্যালিপসের মাস্টার’
১৯৮৯ সালে প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য মেলানকোলি অব রেজিসট্যান্স তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। এই বই পড়ে মার্কিন সাহিত্য সমালোচক সুজান সোনট্যাগ তাঁকে বলেন, “সমসাময়িক সাহিত্যের অ্যাপোক্যালিপসের মাস্টার।”
এই উপন্যাসে সমাজব্যবস্থার ধ্বংসের মধ্যে এক ধরনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান উঠে আসে, যা তাঁকে মধ্য ইউরোপীয় সাহিত্য ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ফেলে—যেখানে ফ্রান্ৎস কাফকা অন্যতম অনুপ্রেরণা।
ভাষা ও ধরণ
ক্রাসনাহোরকাইয়ের লেখনিতে দীর্ঘ, জটিল বাক্য এবং ধীর গতির বর্ণনার মাধ্যমে এক ধরনের হিপনোটিক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। তাঁর রচনায় সাধারণত ছোট কোনো ঘটনার মধ্যেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় অস্তিত্বের গভীর সংকট ও মানবিক বোধের বিপর্যয়।
তাঁর ভাষা একইসঙ্গে কাব্যিক ও বিশ্লেষণাত্মক। পাঠককে তিনি বাধ্য করেন ধৈর্য ধরে গভীরে প্রবেশ করতে—যেন পাঠের প্রক্রিয়াটিই এক প্রকার তপস্যা।
মধ্য ইউরোপীয় ঐতিহ্যের ধারক
কাফকা, মুসিল, থমাস মান কিংবা মিলান কুন্দেরার মতোই ক্রাসনাহোরকাইকে ধরা হয় মধ্য ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী মহাকাব্যিক লেখক হিসেবে। তাঁর সাহিত্য সামাজিক পতনের ভেতরেও মানসিক ও দার্শনিক দৃঢ়তা খোঁজে।
তাঁর লেখায় ঘন ঘন উঠে আসে ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি ও মানবিক দুর্বলতার টানাপোড়েন।
নোবেল স্বীকৃতিতে নতুন অধ্যায়
লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের নোবেল অর্জন মধ্য ইউরোপীয় সাহিত্যের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর সাহিত্য ইউরোপের বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে আলোচিত ছিল, কিন্তু এই পুরস্কারের মাধ্যমে তা এখন বিশ্বসাহিত্যের মূলধারায় নতুন করে স্থান পেল।
সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার পর ক্রাসনাহোরকাই এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন,
“বিশ্ব যতই অন্ধকারের দিকে যাক না কেন, শিল্প আমাদের দেখায় যে এখনো আলো আছে—যদি আমরা দেখতে চাই।”
এই বক্তব্য যেন তাঁর পুরো সাহিত্যজীবনের সারমর্ম—মহাপ্রলয়ের ভেতরেও শিল্পের জয়গান।