শুল্কছাড়ের পরও রমজানে খেজুরের দাম লাগামহীন 

মারুফ আহমেদ

রমজান সংযমের মাস। কিন্তু পবিত্র এই মাসটি বাংলাদেশে শুরু হলেই যেন রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের পাশাপাশি স্রষ্টার কাছে দেশবাসীর আরেকটি আকুল প্রার্থনা শোনা যায়—“নিত্যপণ্যের দাম কমিয়ে দাও প্রভু।”

গত বছরের মাহে রমজান থেকে এ বছর অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম মনিটরিংয়ের আওতায় ছিল। বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাবের অভিযোগ থাকলেও বছরজুড়ে ভোক্তা অধিকার সংস্থার তৎপরতা চোখে পড়েছে। আওয়ামী সরকারের সময় সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল একটি মন্তব্য—“রোজায় বড়ই দিয়ে ইফতার করো। খেজুর না খেলে কি রোজা হয় না?”

কিন্তু খেজুর ও রোজার সঙ্গে এ দেশের রোজাদারদের আত্মিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এ সম্পর্ককে অবহেলা করার পরিণতি কখনও শুভ হয় না—এ কথা অনেকে উপলব্ধি করলেও একশ্রেণীর সিন্ডিকেটের মনোভাব বদলাতে দেখা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যের এই সুমিষ্ট ফলটির ওপর তাদের কুনজর পড়ে ঠিক মাহে রমজান দরজায় কড়া নাড়লেই। রোজার আগমুহূর্তে পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে সেই চিত্রই দেখা গেছে।

অনেকের বিস্ময়—রমজান এলেই কিছু ব্যবসায়ীর আচরণ যেন বদলে যায়। খেজুর কিনতে আসা মো. আলমগীর হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রোজা আসলে এদের ইবলিশে লাড়া মারে!” বাজারে একই খেজুরের দামে বিস্তর পার্থক্য চোখে পড়ে। সবচেয়ে দামী খেজুর মেডজুল—কোনো দোকানে কেজি ১,৮০০ টাকা, পাশের দোকানে ১,৫০০ টাকা। আবার আজওয়া খেজুর এক দোকানে ১,৩০০ টাকা বেশি রাখা হচ্ছে, পাশের দোকানে একই খেজুর ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমদানিকৃত একই খেজুর, একই বাজার—তবু দামের এমন তারতম্যের কারণ কী? অনেক ক্রেতাই খেজুর কিনতে এসে প্রতারিত হচ্ছেন। তবে যারা বাজার ঘুরে আগে দাম যাচাই করতে পারছেন, তারা কিছুটা সাশ্রয় করতে সক্ষম হচ্ছেন। কিন্তু সবার তো বাজার ঘোরার সময় থাকে না। এই সুযোগেই কিছু বিক্রেতা দাম বাড়িয়ে খেজুর বিক্রি করছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, রোজায় খেজুরের সরবরাহ ও বাজারমূল্য স্বাভাবিক রাখতে শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে খেজুর আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। শুল্কহার কমানোর পর ডিসেম্বর থেকে দেশে ৪৫ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে। কিন্তু তারপরও বাজারে খেজুরের দাম হাতের নাগালে আসেনি।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ১৬০ টাকায় ইরাকি খেজুর বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে এ খেজুর সংগ্রহ করতেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। মাত্র আধা কেজি খেজুর পেতে হলে হতে হবে ফ্যামিলি কার্ডধারী সৌভাগ্যবানদের একজন।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের অভিযোগ এড়িয়ে দায় চাপাচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর। তাদের দাবি, “আমরা কেজিতে ২০ টাকা ছাড় দিলেও খুচরা বিক্রেতারা ১০০-২০০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।” অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেট কারবারিরা বন্দরে খেজুর খালাসে বিলম্ব, জাহাজ ডুবি বা সমসাময়িক নির্বাচনী ছুটির অজুহাত তৈরি করে দাম বৃদ্ধির পায়তারা করছেন। যা একদিকে বেআইনি, অন্যদিকে সংযমের মাসের চেতনার পরিপন্থী।

তবে বাজার মনিটরিং বিশেষজ্ঞদের মতে, মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রতি রমজানে খেজুরের চাহিদা ৭০-৮০ হাজার টন। সেখানে আমদানি হয় তার প্রায় অর্ধেক। চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধান থাকলে বাজারে একটি চক্র সুযোগ নেওয়ার পরিবেশ পায়।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—দামি খেজুরের কারণে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের বড় অংশ ইফতারে কাঙ্ক্ষিত খেজুর কিনতে পারেন না। ক্রেতাদের হাতে থাকা ছোট প্যাকেটই যেন সেই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। অনেকেই স্বল্প পরিমাণ খেজুর কিনেই তৃপ্ত মনে ইফতার করার প্রস্তুতি নেন—এই দৃশ্য আবেগও তৈরি করে।

বর্তমানে কম দামের খেজুরের মধ্যে রয়েছে—ইরাকি বস্তার খেজুর কেজি ২০০ টাকা, দাবাস ও জাহিদি ৫০০-৬০০ টাকা, বড়ই ৬০০ টাকা, কালমি ৮০০ টাকা, সুক্কারি ১,০০০ টাকা, মাবরুম ৯০০ টাকা, মরিয়ম ১,৩০০ টাকা এবং মেডজুল ১,৭০০ টাকা। পাইকারি বাজারে এসব খেজুরের দাম ২০-১০০ টাকা বাড়লেই খুচরা পর্যায়ে এসে তা ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকার বাজার মনিটরিংয়ে ভোক্তা অধিকারের ওপর যে গুরুত্ব দিয়েছিল, নতুন দায়িত্ব পাওয়া তারেক রহমানের সরকারের কাছে ক্রেতাসাধারণের দাবি—সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় প্রভাব যেন বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যে অনুপ্রবেশ না করে। বাজার কমিটির পদ অলঙ্কৃত করে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট বাহিনী যদি লাগামহীন থাকে এবং ভোক্তা অধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষকদের লাঞ্ছনার মুখে পড়তে হয়, তবে তা নতুন সরকারের ভাবমূর্তির জন্যও অশনিসংকেত হয়ে উঠতে পারে।

রমজান সংযমের মাস—কিন্তু বাজারে যদি সংযম না থাকে, তবে ভোক্তার দীর্ঘশ্বাসই হয়তো সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *