শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা খাতের চলমান কার্যক্রম, সংস্কার পরিকল্পনা এবং সাম্প্রতিক নানা ইস্যুতে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
মন্ত্রী বলেন, অতীতে বিশেষ পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা স্থগিত বা অটোপাসের মতো কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে সেগুলো স্থায়ী সমাধান ছিল না। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী, মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনা।
আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণে যেন কোনো অনিয়ম না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের দলীয়করণ ও ক্লাস ফেলে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব পাঠদান। দাবি-দাওয়া থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। তবে শ্রেণিকক্ষ ফেলে রাজপথে নামা গ্রহণযোগ্য নয়।
শিক্ষার মান ধরে রাখতে নকলবিরোধী অবস্থান অব্যাহত থাকবে বলে জানান মন্ত্রী। ভবিষ্যতে অভিযানের প্রয়োজন না পড়ে—এমন পরিবেশ তৈরি করতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা ও নিয়মিত অধ্যয়নচর্চা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
উপকূল, চর ও হাওর অঞ্চলে বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাহত হলে বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বিকল্প পদ্ধতি ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের কাজ চলছে বলে জানান মন্ত্রী। এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড–এর কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শিক্ষা কমিশন গঠনের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা বাড়াতে বিধিমালা ও মনিটরিং জোরদার করা হবে। শিক্ষক নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়ে জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ–এর কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রায় ১ হাজার ৭০০ এমপিও আবেদন চূড়ান্ত হওয়ার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বাজেট বরাদ্দ ও যাচাই-বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইংরেজি মাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নিবন্ধন ছাড়া কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ থাকবে না। অগ্নি নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করা হবে বলেও জানান তিনি।
বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট পুনর্গঠন করে বকেয়া ভাতা পরিশোধের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক শিক্ষা বাড়ানো, শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ জোরদার এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী সরকারের তিনটি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার তুলে ধরেন—
১. শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি
২. জাতীয় কারিকুলাম রিভিউ ও পরিমার্জন
৩. কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন
এ ছাড়া “ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব” কর্মসূচি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ১৮০ দিনের রোডম্যাপ শিগগির প্রকাশ করা হবে।
সবশেষে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা খাতে দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না। নৈতিকতা, জবাবদিহিতা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।