মারুফ আহমেদ
রমজান সংযমের মাস। পবিত্র এই মাসটি বাংলাদেশে শুরু হলেই মানুষ রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত কামনা করে। কিন্তু বাস্তবে বাজার ঘুরলে শোনা যাচ্ছে আরেক আকুতি—নিত্যপণ্যের দাম কমুক। কারণ রোজার শুরু থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ক্রেতাদের ভোগান্তিতে ফেলেছে।
বাজারের চিত্র বলছে, রোজার প্রথম দিন থেকেই দাম বাড়ার প্রবণতা স্পষ্ট। অনেকে বাজারে গিয়ে সামান্য কেনাকাটা করে ফিরছেন। কেউ দরদাম করেও খালি হাতে বাড়ি যাচ্ছেন হতাশা নিয়ে। সিয়াম সাধনার মাসে ইফতার ও সেহরিতে পরিবারের জন্য একটু ভালো খাবারের প্রত্যাশা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা মনিটরিং ও ভোক্তা অধিকারের জরিমানাকেও তোয়াক্কা করছেন না—এমন অভিযোগও রয়েছে।
মো. জসিম ইফতারের বেগুনির জন্য বেগুন কিনতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, “রোজার আগে লম্বা বেগুন কিনেছি ৫০–৬০ টাকায়। এখন কিনছি ৮০ টাকা কেজি। ইফতারে বেগুনি না খেলে রোজা হয় না—তা মানি না, কিন্তু ঘরে বেগুন না নিয়ে গেলে বাজারের দামের আগুনের চেয়ে ঘরের আগুনই বেশি জ্বলবে।”
ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১১০ টাকা। মাছ, মুরগি ও গোশতের দামও রোজায় আগের তুলনায় বেশি নেওয়া হচ্ছে। ৭৫০ টাকার গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০–৯০০ টাকায়; কোথাও কোথাও ১,০০০ টাকাও নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। ১,০০০–১,২০০ টাকার খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১,৪০০–১,৫০০ টাকায়।
টমেটো ও কাঁচামরিচের দামও বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানেন—পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, টমেটো, লেবু, খিরাই ও শসা রোজাদারদের তালিকার প্রধান উপকরণ। অভিযোগ রয়েছে, সেই সুযোগই নিচ্ছেন অসাধু কারবারিরা। লেবুর দাম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রসিকতা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, লেবু কি সোনার দরে ভরি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে? বাজারে ভালো জাতের এক হালি লেবুর দাম ১২০ টাকা—যেখানে এক হালি ডিমের দামও ১২০ টাকা। অনেকের কাছে এই সমতা অস্বস্তিকর। সারাদিন রোজা রেখে অনেকে এক গ্লাস লেবুর শরবতও খেতে পারছেন না।
বেলের শরবতেও স্বস্তি নেই। একটি বেলের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।
আলুর ক্ষেত্রেও বাজারভেদে পার্থক্য স্পষ্ট। পথের ভ্যানগাড়িতে ৬–৭ কেজি ‘ডায়মন্ড’ আলু ১০০ টাকায় পাওয়া গেলেও বাজারে একই আলু কেজি ৩০ টাকা। পেঁয়াজ ৫ কেজি ৩০০ টাকা; কোথাও কেজি ৭০ টাকা। ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজান এলেই মিথ্যা অজুহাতে দাম বাড়ানো হয়। বিক্রেতাদের বক্তব্য ভিন্ন—চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই বিক্রিও বেশি দামে।
শসা ও খিরাই বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। কাঁচামরিচ ১৬০ টাকা। বাজারে সবচেয়ে সস্তা ছিল ধনেপাতা ও পুদিনাপাতা—১০ টাকার পাতা এখন ২০ টাকা। বেগুন, টমেটো ও শসার দাম কেজিতে ২০ টাকা করে বাড়ানোকে অনেক ক্রেতা ইচ্ছাকৃত বলে মনে করছেন।
মাছের বাজারেও একই চিত্র। ছোট-বড় সব মাছেই কেজিতে ৫০–৬০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। রুই, কাতলা, পাঙাস, তেলাপিয়া, কই, শিং, পাবদা—সব মাছের দাম বেড়েছে।
রোজার অন্যতম খাবার কলার দামও চড়া। ৭০ টাকার চম্পা কলা এখন ১৩০ টাকা। সবরি ও বাংলা কলায় আরও ২০ টাকা বেশি। অনেকেই সাগর কলার দিকে দামের ভয়ে ঝুঁকছেন না। পাকা পেঁপে, বরই, কাজী পেয়ারা—সব দেশি ফলে ২০–৩০ টাকা বাড়তি।
চিনি, চিড়া ও গুড়ের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে। বিদেশি ফল—আঙুর, মাল্টা, কমলা, আপেল, খেজুর—কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে ক্রেতা কমেছে। তবে যাঁরা নিয়মিত ফল খান, তাঁরা দাম বাড়লেও ইফতারের আয়োজনে বিদেশি ফল রাখছেন।
মাছের পর মুরগির দিকে ঝোঁকেন অনেকেই। কিন্তু ব্রয়লার মুরগি রোজার আগে ১৭০ টাকা থাকলেও এখন ২২০ টাকা। সোনালি মুরগি কেজিতে ৫০ টাকা বেড়েছে; অনেক দোকানে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
তবে ছোলা, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলে তুলনামূলকভাবে কম বৃদ্ধি দেখা গেছে। আগের দামের সঙ্গে ৫–১০ টাকা পার্থক্য। ভোজ্যতেলে লিটারে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। ৭০০ টাকার তেল কোথাও ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জানিয়েছে, “এ দেশের ব্যবসায়ীদের হাতে ক্রেতারা বরাবরই অসহায়। রমজান আসার আগেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো হয়।” সংগঠনটি মনিটরিং জোরদার ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে কার্ডধারীদের জন্য ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বুট, ডাল, চিনি, তেল ও খেজুরের প্যাকেজ দিচ্ছে। রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ৬০০ টাকায় সংগ্রহ করতে হচ্ছে এই নিত্যপণ্যের ঝোলা। নতুন সরকারের ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কবে হাতে পাবেন মানুষ—সে প্রতীক্ষায় হয়তো শেষ হয়ে যাবে এবারের মাহে রমজান।
বাজারের এই দামের আগুন নেভাতে কার্যকর ভূমিকা দৃশ্যমান নয়—এমন অভিযোগই জোরালো।