আদানি চুক্তি পুনর্বিবেচনায় বিএনপি সরকার

দেশে সরকার পরিবর্তনের মাত্র তিন দিনের মাথায় বহুল আলোচিত আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বৃহস্পতিবার (১৯শে ফেব্রুয়ারী) সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে চুক্তিটি বাতিল, সংশোধন অথবা বহাল রাখার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়।

ভারতের শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপ-এর সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। বর্তমান সরকার জানিয়েছে, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আগামী সপ্তাহে অগ্রগতি হতে পারে।

চুক্তির আওতায় ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত ১৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। জাতীয় কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রটি বাংলাদেশে স্থাপনের কথা থাকলেও পরে তা ভারতে নির্মাণ করা হয়। প্রতিবেদনে চুক্তিটিকে “দেশের স্বার্থবিরোধী” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল আপত্তি মূলত তিনটি বিষয়ে—

  • কয়লার মূল্য নির্ধারণ
  • ক্যাপাসিটি চার্জ
  • অন্যান্য আর্থিক শর্ত

প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, চুক্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও ঘুষের ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের গড় মূল্য ইউনিটপ্রতি প্রায় ৮ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু আদানি থেকে কেনা বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা।

কয়লার মূল্য নির্ধারণে অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার আন্তর্জাতিক সূচক অনুসরণের শর্ত নিয়েও দুই পক্ষের বিরোধ রয়েছে। পিডিবির দাবি, মূল্য নির্ধারণে অসঙ্গতি আছে, তাই পুরো বিল পরিশোধ করা হচ্ছে না। অন্যদিকে আদানি গ্রুপ অভিযোগ করেছে, চুক্তি অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ করা হয়নি।

এই বিরোধ গত তিন বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের আর্থিক জটিলতায় পরিণত হয়েছে। গত অক্টোবরে সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়া শুরু করে আদানি। বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক আইনি নিষ্পত্তির পথে রয়েছে।

সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দিয়ে চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিল। ফলে একতরফাভাবে বাতিল করা সহজ নয়।

পিডিবি চেয়ারম্যান বৈঠকে জানান, আদানি থেকে ১৬০০ মেগাওয়াট সরবরাহের পাশাপাশি ভারত থেকে আরও প্রায় ১১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হয়। চুক্তি হঠাৎ বাতিল হলে জাতীয় গ্রিডে চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

সরকার বলছে, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তারা দেশের স্বার্থ বিবেচনায় চুক্তিটি খতিয়ে দেখবে। তবে সিদ্ধান্ত যাই হোক, সেটি শুধু রাজনৈতিক নয়—আইনি, কূটনৈতিক এবং জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে এই চুক্তি এখন একটি বড় পরীক্ষা—রাষ্ট্রের আর্থিক দায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জ্বালানি স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেটিই দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *